গত বছর আগস্ট মাসের কথা। আমাদের রসায়নের বিভাগীয় প্রধান প্রাণরসায়নবিদ ড. রবিউল হক আমাকে তিনটা জিনিস আনতে দিলেন ঢাকা থেকে। কেজি খানেক পনির, পেপরিকা ও বেল পিপারের বীজ এবং লেটুসের বীজ। ঠিক বুঝতে পারিনি তখনও এর মাজেজাটা কি? যাক নিয়ে এসেছি। পৌঁছে দিতে ডিপার্টমেন্টে যখন গেলুম-কাপে গরম কফির ধোঁয়া উড়ছে, সাথে সেই পোড়া পোড়া মাদাকতাপূর্ণ ঘ্রাণ। বলা বাহুল্য, আমার জন্যও এক কাপ বরাদ্দ হলো আর চুম্বক দিতে দিতে কথা চলছে। আমেরিকার জীবন যাত্রা খাদ্যাভাস প্রভৃতির সাথে জাপানীজ কালচারের কিয়াস। একটা কুট বুদ্ধি খেলে গেলে মাথায়। সাথে সাথে অ্যাকসান। বার্গার, পিৎজা, স্যালাদ, সব কিছুর জন্য তো আগে দরকার জিনিসটা গাছে ফলানো। স্যার তার হাইড্রোফনিক্স নিয়ে কথা বলতে লাগলেন আর আমি এদিকে কিছু বীজ লুটপাটে লেগে গেলুম। কফির জন্য ধন্যবাদ দিয়ে সোজা লাইব্রেরী। যত বই আর যা আছে- ঘেটে যে মাখন পাওয়া গেল তার বাস-ব প্রয়োগের জন্য ছুট আবার হর্টিকালচার ডিপার্টমেন্ট এবং ফার্ম সুপারের কাছে। এই প্রথম ব্যক্তিগত প্রজেক্টের জন্য একটা প্লট বরাদ্দ হলো টমেটো আর কল ক্রপসের ফার্মের মাঝে। মোট তিনটে স্ট্যান্ডার্ড মাপের প্লট প্রস’ত করলাম এবং স্যারের অজানে-ই টবে বীজতলা করে চারা উৎপাদন করে লাগিয়ে দেওয়ার প্রস’তি প্রায় চূড়ান-। যখন স্যারকে জানানো হলে বললেন, দুটো টবে দুটো গাছ বসাতে আর দুই প্লটে ২০ দিনের ব্যবধানে একই বয়সী চারা লাগাতে। তাঁর নির্দেশনা মতই কাজ চলছিল। কিন’ ৩য় বর্ষ ফাইনাল পরীক্ষার কারণে ৩ মাস পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ ও ফলাফল সংগ্রহ সম্ভব হয়নি। তারপরেও যা হয়েছে, তা হলো- দক্ষিণাঞ্চলে শীত ও শীত পরবর্তী সময়ে লবণাক্ততা (পটুয়াখালী) এবং সেচ অসুবিধা সত্ত্বেও মিষ্টি মরিচের কাঙিক্ষত উৎপাদন সম্ভব। * শুধু টবে নয়, মাঠেও এর বাণিজ্যিক উৎপাদন সম্ভব। * আর কিছু না হোক পিৎজার কাঁচামাল সাথে স্যারের ওভেনে…..। মিষ্টি মরিচ একটি অর্থকরী মশলা ও সালাদ জাতীয় ফসল। শীত প্রধান দেশ ও আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে সবজি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে ফাষ্ট ফুড, বিদেশী খাবারের দোকান ও ডিশ এন্টেনার কল্যাণে চেঞ্জ হয়ে যাওয়া খাদ্যাভাস ও মেনুতে এর যথেষ্ট চাহিদা আছে। নিউ মার্কেট ও গুলশান বনানীর বাজারে এদের বেশ সমাগম দেখা যায়। পরিবার ও প্রজাতি ঃ ঝড়ষধহধপবধ বা বেগুন পরিবারের সদস্য। ঐবরংবৎ ধহফ ঝসরঃয (১৯৫৩) এর মতে ঈধঢ়ংরপঁস ধহহঁস এর অন-র্ভুক্ত, তবে এর প.ধ. মৎড়ংংরস নামটিও দেখা যায়। আমার সংগৃহীত জাতটি বধৎষু ঢ়ৎড়ষরভরপ নামে পরিচিত এবং ঢাকার বীজ মার্কেটের লোকজন হল্যান্ডের মিষ্টি মরিচ নামে আমাকে ধরিয়ে দিল। আসলে তা ছিল নরষষ ঢ়বঢ়বৎ এর একটি জাত। পুষ্টিমান ঃ (প্রতি ১০০ গ্রামে) উপাদান কাঁচা মরিচ / সালাদ (ম) পানি ৮৩-৮৬ আমিষ ২০-৩ শ্বেতসার ৬ আঁশ ৭ স্নেহ .৬ ক্যারোটিন (ওঠ) ১০০-২০০০০ থায়ামিন (সম) .০৬ রাইবোফ্লেভিন .০৮ নায়াসিন ১. ভিটামিন-ঈ ২৫-২৮০ জলবায়ু ঃ * গ্রীষ্ম প্রধান জলবায়ু। বাংলাদেশে শীতকালীন ফসল হিসেবে চাষ করা যায়। * ১৭০ থেকে ৩০০ঈ তাপমাত্রা এর ফল ধারনের উপযোগী। * ১৫০ঈ এর নিচে এবং ৩৫০ঈ এর উপরে ফুল ও ফল ঝরে পড়ে ২৫০ঈ তাপমাত্রায় ভালো হয়। * রাত্রিকালীন তাপমাত্রা ৭০ঈ এর উপরে। * খাটো দিবসে তাড়াতাড়ি ফুল আসে। * এই হিসেবে অক্টোবরের মাঝামাঝি ও শেষে ২০ দিনের ব্যবধানে চারা উৎপাদন ও রোপণ করা হয়েছিল। মাটি ঃ * সুনির্দিষ্ট উর্বর দোঁয়াশ মাটি * ঢ়ঐ ৬.০ - ৭.৫ দুমকী কৃষি কলেজের ফার্মের সামনের দিকের অংশে লাগানো হয়। বীজবপন চারা রোপন ঃ অক্টোবরের ৫ এবং ২০ তারিখে বীজতলায় চারা উৎপাদনের জন্য বীজ ফেলা হয়। ৩০ দিন বয়সের চারা উৎপাদন করা হয়। বীজ অংকুরোদগমের সময় ১৪-২১ দিন। গাছের গঠন ঃ * সাধারণ মরিচ গাছের তুলনায় ঝোপালো উদ্ভিদ। * পাতা সাধারণ মরিচ গাছের তুলনায় বড় ও গাঢ় রং এর। * সাদা ফুল ফোটে এবং নবষষ ঢ়বঢ়বৎ বা বড় গোলাকার ফল, হাঙ্গেরিয়ান মিষ্টি মরিচ নামে হলুদ রং এর আর একটি জাত বাজারে আছে। কিছু চীনা হাইব্রিড জাতও পাওয়া যায়। * শেকড় ও দেহ বেশ বিস-ৃত। তাই গাছ থেকে গাছের ফাঁক একটু বেশী দিতে হবে। জমি তৈরি/ সার প্রয়োগ ঃ * ৫-৬ বার চাষ ও খই দিয়ে মাটি ঝুর ঝুরে করে নেওয়া হয়। প্রতি প্লটে ১০ কেজি গোবর, ১০ গ্রাম ইউরিয়া, ১৫০ গ্রাম ঞঝচ দেওয়া হয়। * পরবর্তীতে চারা লাগানোর ৪০ দিন ও ৮০ দিন পর দুই কিসি-তে আরও ২৫ গ্রাম করে ইউরিয়া ও ২৫০ গ্রাম করে গচ দিয়ে সেচ দেওয়া হয়। চারা রোপন ৩০ দিন বয়সের চারা নভেম্বরের প্রথমে ও মাঝে লাগানো হয়। লাইন-লাইন দূরত্ব ৫০ সে.মি. এবং গাছ-গাছের দূরত্ব ৫০ সে.মি, দেওয়া হয়। * টবে ১টি করে চারা রাখা হয়। ফলন ঃ * ডিসেম্বর হতে প্রথম ফল পাওয়া যায়। তবে ফেব্রুয়ারি পর্যন- মাঠে মরিচ ধরেছে। এর পর ফুল ফুটলেও তাপমাত্রার কারণে সংখ্যা কমে আসে। * প্রতি গাছে গড়ে ১৫টি এবং সর্বোচ্চ ২০টি ফল পাওয়া গেছে। * সম্পূর্ণ পরিপক্ক হতে প্রায় ৭০ দিন সময় লেগে গেছে। * মিষ্টি মরিচ আসলে মিষ্টি না। ঝালহীন মরিচের গন্ধযুক্ত একটি সবজি ফসল। * মোটা ও পুরু শাঁসযুক্ত। * ২০ দিন ব্যবধানে যে গবেষণার জন্য লাগানো হয়েছিল তার কোন রেকর্ড নেই। বিশেষ পরিচর্যা ঃ সেচ- * প্রচুর পানি সেচ দিতে হয়েছে। সপ্তাহে ৩/৪ দিন বিকালে হোসপাইপ দিয়ে প্লটে পানি দেয়া হয়। * টবেও একই অবস’া। এই কারণে সার একটু বেশি লেগেছে। * তা ছাড়া ডিসেম্বরের শেষে মেঘলা আকাশ ও হালকা বৃষ্টিপাতের পর উজ্জ্বল সূর্যালোক উৎপাদন বৃদ্দি করেছে। স্টাকিং- * সর্বোচ্চ ফলনের সময় গাছের পাশে লাঠি পুঁতে খাড়া করে বেঁধে দেওয়া হয়, যাতে ফলের ভারে ভেঙ্গে না পড়ে। * পরীক্ষামূলকভাবে ফাঁকা ফাঁকা করে লাগানো গাছের মাঝে প্রতিপ্লটে ২টি করে (দুই মাথায়) গাঁদাফুল গাছ লাগানো হয়েছিল কিছুটা দুষ্টামী করে। পরে অবশ্য জানা গেল, এটা নাকি নেমাটোড প্রতিহত করে। * ফুল আসার পর একবার ম্যালাথিয়ন সেপ্র করা হয়েছিল। শেষ কথা- কোন বৈজ্ঞানিক নিয়মমাফিক তথ্য সংগ্রহে রাখা যায়নি বলে একে একটি বৈজ্ঞানিক রচনা/ ফলাফল বলে উপস’াপন করা গেল না ঠিকই। তবে এর সাফল্যও চেখে পরখ করে দেখেছেন তৎকালীন প্রিন্সিপাল ড. হারুন অর রশিদ, প্যাথলজী হেড হাবিবুর রহমান সহ অনেকেই, আর হর্টিকালচারারের স্যার তো প্রথমটাই হাদিয়া পেয়েছিলেন। আমার অজানে- কামরাঙ্গা বা বোম্বাই মরিচ মনে করে অনেকেই কচি অবস’ায় ছিড়ে আমার মেজাজ খারাপ করেছে আর গাল শুনেছে। তারপরেও লাভের মধ্যে লাভ এবং ঈড়হপষঁংরড়হ. পটুয়াখালীর মাটিতে টবে এবং মাঠে মিষ্টি মরিচের বাণিজ্যিক উৎপাদন সম্ভব এবং ফলন আশানুরূপ। একই কথা সারা বাংলাদেশের জন্যই। স্মরণীয় ঘটনা-মালয়ী একজন একটা ক্যাপসিকাম চাবিয়ে বলল বাগুস। আমিও বিদায় বেলায় বললাম, বাগুস, লা ফিল ফিল।

2 Responses to “মিষ্টি মরিচের চাষ”

  1. Ruhi Rusaba says:

    Bhia,
    Lekha bagus hoeche.Amio bagus misti morich tobe lagabo.Dekhi bagus hoy ki na.
    Ruhi
    Scout Samatat open scout group

  2. habib says:

    carry on

Leave a Reply

You can use these tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>