“যুগের হাওয়া বদলে যদি দেয় আজকের এই শুভ প্রভাত লাভ কি বল চিন্তা করে অতীতের সেই অমানিশার রাত?” কবির কথাটাকে সত্য বলে মেনে নিয়েই আজকের প্রবন্ধটি আরম্ভ করছি। স্কাউটিং চর্চার ১৯০৮ সালের * এর ধারা ও বর্তমানের মধ্যে অনেক অনেক ফারাক, কারণ ঐ যুগের হাওয়া। বিজ্ঞ স্কাউট নেতৃবৃন্দ যুগ পরিবর্তনের সাথে সাথে স্কাউটিং কার্যক্রম ও কর্মসূচীকেও পরিবর্তন, সংকোচন ও পরিবর্ধন করে যুগোপযোগী করেছেন। আবার অনেক দেশের স্কাউট সংগঠন তাদের আর্থ-সামাজিক অবস’ার উপর ভিত্তি করেও স্কাউটিং প্রোগ্রাম রচনা করেছেন।- অর্থাৎ, আমার এই বাক্যব্যয়ের একটিই উদ্দেশ্য পাঠকদের সুনিশ্চিতভাবে বোধগম্য করা যে, এটি একটি পরিবর্তনশীল প্রোগ্রাম। অনেকদিন ধরে নিজস্ব ব্যক্তিগত চিন-া-ভাবনার ফসল আমার এই রচনা, একথা পাঠক বলতে পারেন এবং আমিও মেনে নিতে রাজি আছি। তবে বিশেষ অনুরোধ, সময় নষ্ট করে নতুন এই চিন্তাটি বোধগম্য করার দুরূহ চেষ্টা করেই দেখুন না, নতুন কোন কিছুর সন্ধান প্রণয়ন ও বাস্তবায়ণ পদ্ধতি সম্পর্কে, মোটামুটি অজ্ঞ এই কলমবাজ দিতে পারে কিনা? ভাষার অনেক জিলাপীর প্যাচ বাদ দিয়ে এবার প্রসঙ্গে আসি। আমার রচনাটির প্রথম অংশটি নিয়ে আমি ক্ষুদ্র জ্ঞানে আলোচনার চেষ্টা করব এবং পরবর্তীতে স্কাউটিং কার্যক্রমের সাথে এর সমন্বয় ও সমপ্রসারণ প্রসঙ্গে কিছু বলব। বিজ্ঞানচর্চা নতুন কিছু নয়, অন-তঃ বিংশ শতাব্দীর এই বিজ্ঞানের যুগ্ম বিজ্ঞান যেমন তার সুন্দর আবিষ্কার দ্বারা মানবিকতা ও ব্যবসার এক সুন্দর সমন্বয় সাধন করেছে, তেমনি বখে যাওয়ার উত্তম সময় কৈশোর ও যৌবনের রক্তের উন্মাদনায় পচে যাবার সময় বিজ্ঞানচর্চার পরোক্ষ সম্পর্ক বাদ দিয়ে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন কি অসম্ভব? সম্ভব কি অসম্ভব তার বিশ্লেষণ পরে হবে। বর্তমানে নজর দেওয়া যাক বাংলাদেশে বিজ্ঞান চর্চার সুযোগ ও পদ্ধতিসমূহের স্বরূপ এবং বাংলাদেশ স্কাউটস, এর প্রোগ্রামে বিজ্ঞান মনস্কতার প্রতিফলনের অবস’ার দিকে। কৈশোর ও তরুণ বয়সে সুষ্ঠু বিজ্ঞান মনস্কতা তৈরি ও চর্চার একটি সুষ্ঠু ও সুগঠিত প্রক্রিয়া প্রণয়ন করে সফল বাস-বায়ন করতে সক্ষম হয়েছেন “বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যাদুঘর”, আগারগাঁও কর্তৃপক্ষ। তাঁদের বিজ্ঞান ক্লাব গঠন কার্যক্রম, বাংলাদেশে বিজ্ঞানচর্চা সমপ্রসারণে নব দিগনে-র উন্মেষ ঘটিয়েছে। স্কুল, কলেজ কিংবা পাড়াভিত্তিক বিজ্ঞানচর্চার মাধ্যমে বিজ্ঞান ক্লাবগুলো সুস’ কিশোর ও তরুণ সমাজকে সংগঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। থানা ভিত্তিক, জেলা ভিত্তিক কিংবা কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান মেলা ও প্রদর্শনী তার বাস-ব প্রমাণ। সেসব কাজগুলোর রয়েছে একটি সুষ্ঠু পরিচালনা কমিটি, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এবং ফলাফলে উৎকর্ষ। আর এই জিনিসটিকে কাজে লাগিয়েই আমার নতুন চিন-া-ভাবনা। স্কাউটিং কার্যক্রমে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, বনকলা ইত্যাদিকে আমি পরোক্ষ বিজ্ঞানচর্চা হিসেবে একারণেই ধরে নেই যে, তার বিস্তার আমাদের স্কাউটিং কার্যক্রমে অত্যন্ত নাতিদীর্ঘ এবং আমাদের দেশের স্কাউটদের প্রকৃতি পর্যবেক্ষনের দৌড় গাছটির উচ্চতা কেমন? পাতা কেমন? কি ধরনের গাছ? খুব বেশী হলে তার নাম কি?- তার মধ্যেই সীমিত। বনকলার কথা তো বলাই বাহুল্য। আমার মনে হয় শহরে অর্থাৎ, যেখানে স্কাউটিং চর্চা অত্যন- গতিশীল তার থেকে গ্রাম পর্যায়ের সাধারণ অনুসন্ধিৎসু মনের ছেলে-মেয়েরা আমাদের থেকে বেশি জানে। অর্থাৎ, এখানে প্রোগ্রামে থাকা সত্ত্বেও সুষ্ঠু বাস-বায়নের অভাবে তা পূর্ণ রূপ লাভ করতে কিছুটা ব্যর্থ হয়েছে। কারণ যে সকল দেশের স্কাউট কার্যক্রমে প্রকৃতি পর্যবেক্ষনের বিষয়টি সম্পৃক্ত হয়েছে, তা আরও বাস-বসম্মত, সকলের গ্রহণযোগ্য ও বিজ্ঞান মনস্কভাবে সম্পৃক্ত হয়েছে। যে কারণে সে সব দেশের স্কাউটরা সুন্দর মার্চ পাস্ট কিংবা ড্রামে রণসঙ্গীত বাজাতে না পারলেও, তার দেশের বনাঞ্চল, তার অতীত ও বর্তমান অবস’া, বনাঞ্চলের বৃক্ষরাজি, পরিবেশ সংরক্ষণে কৃত্রিম বনাঞ্চল সৃষ্টির প্রক্রিয়া সম্পর্কে অনেক বেশি ওয়াকিবহাল। আর সে কারণেই আমাদে মত ‘ঘৃতকুমারী’ নামটা শুনে মুখ ভেংচিয়ে বলে ওঠে না ছি! ছি! এ আবার কি ধরনের নাম? অথচ বিজ্ঞানচর্চা করলে তার এই অবস’া হবার কারণ থাকতেই পারে না। বাংলাদেশে কিশোর ও তরুণ বয়সে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বাদে বিজ্ঞান চর্চার মাধ্যম বিজ্ঞান ক্লাবগুলোতে অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে নানা বিজ্ঞান বিষয়ক বই পত্র ও সংগ্রহে গড়ে ওঠে একটি লাইব্রেরী। প্রতিটি গ্রামে, শহরে, পাড়ায়, স্কুলে,ক্লাব কিংবা সংঘ থাকে। থাকে তাদের নিজস্ব কার্যালয়, লাইব্রেরী ইত্যাদি। আমার প্রস-াবনা হলো যদি এই সব ক্লাবগুলোতে স্কাউটিং কার্যক্রমকে একটি অঙ্গ সংগঠন বা শাখা সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তবে স্কাউটিং সমপ্রসারণের ২০০০ সালের লক্ষ্য আরও দ্রুত গতিসম্পন্ন ও বেগবান হয়ে তার লক্ষ্য ভেদ করবে। স্কুল ও কলেজ-তথা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দ্বারা মূলত আমাদের দেশের স্কাউটিং কার্যক্রম পরিচালিত। তাই খাতা-কলমে স্কাউটের সংখ্যা আমাদের যাই হোক না কেন- স্কাউটিং তার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন করছে কিনা, তা বিবেচ্য বিষয়। কারণ গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্কাউটিং কার্যক্রমের অবস’া বেহাল, কাণ্ডারীবিহীন। অথচ প্রতি গ্রামে বা পাড়ায় গড়ে ওঠা ক্লাব ও লাইব্রেরীগুলো, কিছু উৎসাহী ব্যক্তি, যারা বাড়ির খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে সমাজকে কিছু দিতে চেষ্টা করেন, তাঁদের পরিশ্রমেই গড়ে ওঠে। আর তাই তারা বিজ্ঞানচর্চা করে অনেক ক্ষুদে বিজ্ঞানীর গবেষণা প্রজেক্টই বাস-ব রূপ দিতে সমর্থ হয়েছে। স্কাউটদের যদি বিজ্ঞান ক্লাবের সদস্যদের মত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্ভাবনী কাজে লাগানো যায়, তবে কেউই আর ব্যঙ্গ করে বলতে পারবে না তোদের স্কাউটিং এর অবস’াতো এই যে, দলে থাকে ৩২টা স্কাউট, প্রতি স্কুলে একটা থেকে কয়েকটা ইউনিট অথচ সর্বোচ্চ সাফল্য কিংবা প্রেসিডেন্ট’স স্কাউট বের হয় হাতে গোণা। একথা ঠিক যে, সব কিছুতেই ‘ড্রপ আউট’ থাকে। তবে আমি মনে করি স্কাউট কার্যক্রম যেমন যুগোপযোগী হচ্ছে সেখানে মাইক্রোসফট ওয়্যারের যুগের অতি অনুসন্ধিৎসু মানসিকতার সমাজে আমার এই চিন-া একবারেই অমূলক নয়। তাছাড়া, আর একটা প্রসঙ্গ এখানে উঠতে পারে। সেটি হলো-শুধুমাত্র স্কুল কলেজে যা সমাজের জন্য স্কাউটিংকে বেঁধে না রেখে যদি এমন একটি নতুন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা যায়, যাতে পাড়ায় পাড়ায় গড়ে ওঠো ক্যারাম তাস বা জুয়ার আড্ডা কিংবা অন্য যে কোন অনিষ্ট কিছুতে সম্পৃক্ত না করে কিশোর ও যুব সমাজকে ফিরিয়ে আনা যায়। মুক্তদল চেতনা একটি মাধ্যম, কিন’ কিছু দুর্বলও বটে। কারণ আর্থিক সমস্যার জন্য বেশিরভাগ দলই শেষ পর্যন- টিকে থাকে না। যাই হোক কলম বাজটা এখন থামাতেই হয়। বিজ্ঞানচর্চা তথা বিজ্ঞান ক্লাবের সঙ্গে সমন্বয় ঘটিয়ে একটা সমপ্রসারণ রীতিই আমার আলোচ্য ছিল এবং পরবর্তীতে তা বিকশিত হয়ে এদিক ওদিক অনেক দিকেই ছড়িয়ে গেছে। সুষ্ঠু নির্দেশনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে কিনা বলা আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে কঠিন। তবে আরও পরিপক্ক ও বিজ্ঞ সমাজ, যারা আমাদের এই স্কাউটিং কার্যক্রমের সাথে জড়িত, তারা এর পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারবেন বলে আমি আশা করি। তখন শিক্ষিত, আগ্রহী তথা পুরো সমাজই সুনাগরিক ও সুস’ চেতনাসম্পন্ন হয়ে গড়ে উঠবে। অর্থাৎ, দলগত স্কাউটিং, তার ডালপালা ছড়িয়ে বটবৃক্ষের ন্যায় সামাজিক স্কাউটিং-এর জন্ম দেবে।

Leave a Reply

You can use these tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>