দুনিয়াতে মানুষ অতি সাধারণ একটি ছোট্ট মানব শিশু হয়েই জন্মায়। কিন’ তার কর্ম ও কীর্তির দ্বারা যুগে যুগে কালে কালে স্মরণীয় বরণীয় একজনে পরিণত হয়। তাদের কথা জানতে কে না ভালোবাসে। ছোট্ট বন্ধুরা তোমরাও নিশ্চয়ই খুব আগ্রহী। সে রকম একজনের কথাই আজ বলছি। যিনি তার অসাধারণ সৃষ্টিশীল প্রতিভা ও কাজের জন্য সমগ্র বিশ্বের মানুষের শ্রদ্ধায় ভালোবাসায় চির অমলিন। সমগ্র বিশ্বের ছোট্ট বন্ধু ও কিশোর কিশোরীদের ভালো মানুষ, যোগ্য নাগরিক হয়ে গড়ে তোলার জন্য যে সুন্দর পদ্ধতি লাইট হাউজের ন্যায় পথ দেখিয়ে চলেছে, সেই স্কাউট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ব্যাডেন পাওয়েল বা বি.পি.’র কথাই বলছি।
১৮৫৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন বি.পি। পুরো নাম রবার্ট স্টিফেনসন স্মীথ বেডেন পাওয়েল- সকল স্কাউটদের আদরের ডাক বিপি চীফ স্কাউট অব দ্যা ওয়ার্ল্ড। তার বাবা রেভারেন্ট হারবার্ট জর্জেস ব্যাডেন পাওয়েল ছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন খ্যাতিমান অধ্যাপক ও বিজ্ঞানী। বি.পি.’র মা হ্যানরিয়েটা গ্রেস স্মীথ ছিলেন বৃটিশ নৌবাহিনীর এডমিরাল ডব্লিউ. এইচ. স্মীথের কন্যা। যিনি আমেরিকার ভার্জিনিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিখ্যাত ক্যাপ্টেন জন স্মীথের বংশধর।
সকল বরণীয় ব্যক্তিদের জীবনের মতই বি.পি ১৮৬০ সালে মাত্র তিন বছর বয়সে তার বাবাকে হারান। বেশ অসুবিধা ও আর্থিক দৈন্যতার মধ্যে বড় হতে থাকেন তিনি। কিন’ মায়ের ভালোবাসা আর বড় ভাই ওয়ারিংটনের নেতৃত্বে দলবদ্ধ অ্যাডভেঞ্চারমূলক কাজকর্মে সাত ভাই বোনের শৈশব আনন্দেই কাটছিল। অবসরে তারা ইচ্ছামত ঘুরে বেড়াতেন, ক্যাম্পিং এ যেতেন, এমনকি নৌকা বেয়ে টেমস নদীর মোহনা কিংবা নরওয়ের উপকুলেও চলে যেতেন।
ছোটবেলা থেকেই বি.পি’র মধ্যে ছিল কিছু অসাধারণ গুণ। তিনি দু’ হাতেই সমান তালে ছবি আঁকতে পারতেন এবং অদ্ভুত সব স্কেচ ড্রইং করে তার নোট বুকগুলো সাজিয়ে তুলতেন। মার কাজে সাহায্য করতে করতে এবং ভাই বোনদের সাথে ক্যাম্পিং এ কেবিন বয়ের কাজ করে তিনি ভালো রান্নাও শিখেছিলেন।
‘ডেইম স্কুল’ ও ‘রোজ হিল পিপ্রারেটরী স্কুল’ হয়ে ১৮৭০ সালে ‘গাউন বয় ফাউন্ডেশনার বৃত্তি’ নিয়ে তিনি ভর্তি হন লন্ডনের বিখ্যাত চার্টার হাউজ স্কুলে। এখানে সবার প্রিয় ও আদরের পাত্র তিনি। পেটে খিল ধরানো কৌতুক অভিনেতা, চার্টার হাউজ স্কুল ফুটবল টিমের শ্রেষ্ঠ গোলরক্ষক, পড়াশোনায় মেধাবী, ছবি আঁকা সব ক্ষেত্রেই তিনি সমান পারদর্শী। এর মাঝেই প্রকৃতি প্রেমিক বি.পি পাশের জঙ্গলে চলে যেতেন সবুজ বনানী আর পশুপাখি সম্পর্কে জানতে। যদিও ছাত্রদের জন্য সেই বনে প্রবেশ নিষেধ, কিন’ বিপি রাগী সব শিক্ষকদের চোখ এড়িয়ে বনে বনে ঘুরে বেড়ান। স্কেচ করেন আর ধোঁয়া না করে বন্য খরগোশ পুড়িয়ে খান। আসলে পরীক্ষামূলক কাজে উৎসাহী, দায়িত্বশীল ও সব ব্যাপারে সচেতন হলে গড়ে উঠতে এবং অবসরে স্কুলের পাশের গ্রামীণ পরিবেশ, নির্জনতা, ক্যাম্পিং এই সকল শিক্ষাকে তিনি বাস-ব জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় মনে করতেন। পরবর্তীতে এগুলোই স্কাউটিং এর মৌলিক বিষয় হিসেবে এসেছে।
১৮৭৬ সালে উনিশ বছর বয়সে চার্টার হাউজ থেকে কৃতিত্বের সাথে গ্রাজুয়েশন করেন তিনি। পরিবারের ইচ্ছা, তিনি তার ভাইদের মত অক্সফোর্ডে পড়েন। কিন’ বি.পি এ ব্যাপারে উদাসীন। তার চাই বাঁধা ধরা নিয়মের বাইরে মজার রোমাঞ্চকর কাজ। পরিকল্পনা করলেন বিশ্বভ্রমনের। ঠিক তখনই হুজুগে পড়ে পরীক্ষা দিলেন সেনাবাহিনীতে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি ৪র্থ হয়ে সরাসরি কমিশন পেলেন সাব ল্যাফটেনেন্ট হিসেবে। তারপর ১৮৭৬ সালে পোর্টস মাউথ থেকে এস.এস সিরাপিস নামক জাহাজে চড়ে সোজা ভারত। তার কর্মস’ল লক্ষ্মৌ ‘১৩শ হুসার্স রেজিমেন্ট।’ ভারত তার প্রথম কর্মস’ল এবং কর্মজীবনের সূচনাস’ল। এবং এখান থেকেই তাঁর সাফল্যের সূচনা। বি.পি যদিও তার জীবনের প্রয়োজনে একজন সামরিক বাহিনীর অফিসার ছিলেন, কিন’ তিনি বরাবরই বাধাধরা বৈচিত্রহীন জীবন পছন্দ করতেন না। তাই সৈনিক জীবনকেও আনন্দে উপভোগ্য করে কাটাতে পিগ স্টিকিং বা লম্বা চোখা লাঠি দিয়ে হিংস্র বুনো শুকর শিকার করে, বুনো ঘোড়াকে পোষ মানিয়ে কিংবা বিভিন্ন খেলাধূলায় কাটাতেন। বিপি সব সময়ই তার দায়িত্ব সচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন। তাই বৃটিশ সেনাবাহিনীর রণক্ষেত্র থেকে গোয়েন্দা শাখা, ভারত থেকে আফ্রিকা, আয়ারল্যান্ড থেকে আফগান সব জায়গাই বি.পি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তিনি একজন দেশপ্রেমিক সৈনিক হিসাবে তুখোড় গোয়েন্দা হিসেবে কাজ করেন। আফ্রিকায় ম্যাফেকিং অভিযান একদিকে যেমন একজন বাধা ধরা সামরিক অফিসার ব্যাডেন পাওয়েলের জন্য চির স্মরণীয়, তেমনি মুক্তাঙ্গনে কাজ ও শিক্ষা তথা স্কাউটিং চেতনার সৃষ্টি এ সময়ই। বি.পি ম্যাফেকিং এ খ্যাতির জন্য মাত্র ৪৩ বছর বয়সে বৃটিশ সেনাবাহিনীর কনিষ্ঠ মেজর জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি পান।
কিন’ পরবর্তীতে এই বি.পিই যুদ্ধ এবং সেনাবাহিনীর ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়েন। তার মতে, ‘যুদ্ধ মানব সভ্যতার সবচেয়ে মুল্যবান সম্পদ তরুন তথা যুব সমপ্রদায়ের মৃত্যু ঘটায়।’ আর একারণেই তিনি সামরিক ব্যক্তিত্ব থেকে অসামরিক সমাজ সংস্কারক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। বি.পি সেনাবাহিনী সদস্যদের জন্য ‘এইডস টু স্কাউটিং’ বই লিখে দেখলেন যে, এই সকল কাজকে যদি অসামরিকভাবে পড়াশোনার পাশাপাশি বালকদের অবসর সময়ের সদ্ব্যবহার ও বিনোদনমূলক করে প্রয়োগ করা যায়, তবে তারা প্রকৃত মানব সম্পদে পরিনত হয় এবং যুদ্ধ, হানাহানি ও অশ্লীলতা এবং কুসংস্কারমুক্ত সমাজ গঠন করা সম্ভব। আর তাই সারা বিশ্বে সম্মানিত এবং প্রশংসিত তার স্কাউটিং এবং তিনি নিজে।
বৃটেনের সবচেয়ে সম্মানের নাইট উপাধি সহ প্রায় অর্ধ শতাধিক সর্বোচ্চ সম্মান ও পদক প্রাপ্তি এবং বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ডক্টরেট ডিগ্রী এই অসামান্য ব্যক্তিকে আত্মঅহংকারী করেনি। আর তাই জীবনের শেষ প্রানে- তিনি ফিরে আসেন তার প্রিয় আফ্রিকায়। কেনিয়ার নাইরোবিতে তার ছোট্ট নিবাস প্যাক-টু। এক আনন্দের অথচ বিলাসী নয়, জীবন কাটাতে থাকেন বি.পি এখানে। লেডি বি.পিও তার সাথী ছিলেন।
এক শান- ও উত্তেজনাহীন জীবন কাটাতে কাটাতে সম্পূর্ণ নিসে-জ হয়ে এই ধরাধাম ত্যাগ করেন ১৯৪১ সালের ৮ জানুয়ারি। সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।
যদিও চীফ স্কাউট আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন, কিন’ তার জীবন, তাঁর কর্ম, তাঁর চেতনা, তাঁর আন্দোলন, তাঁর বিপ্লব সব কিছুতেই তাঁর অসি-ত্ব অনুধাবন করা যায়। বৃটিশ লেখ বার্নাড শ’র মতে- ‘বি.পি প্রতিষ্ঠিত স্কাউটিংই শিশুদের জীবনকে সংগঠিতক করার ক্ষেত্রে আমাদের প্রথম পদক্ষেপ।’