আবারও একটি প্রকল্প! হ্যাঁ, স্কাউট ভাই-বোন বন্ধুরা পূর্বের ন্যায় এবারও আমাদের আশেপাশে প্রাপ্ত সুযোগ সুবিধার সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে একটি স্বনির্ভর উপার্জনমুখী আকর্ষণীয় প্রকল্পকে আপনাদের খেদমতে উপস’াপনের জন্য আমার এই প্রয়াস। কবুতর পালন আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়। তবে উপার্জনমুখী প্রকল্প হিসেবে উপস’াপিত কবুতর পালন আমাদের সনাতন কবুতর পালন থেকে কিছুটা ভিন্ন। তবে সনাতনের থেকে অধিক লাভজনক ও অসুবিধাবিহীন।
আর বৃথা বাক্য ব্যয় নয়, আসুন তবে সবার জন্য নতুন প্রকল্প ‘আধুনিক কবুতর পালন।’ মনে রাখবেন আমি এখানে যাই বলব, সবই কিন’ বাস-বে প্রয়োগ করে বিচার বিশ্লেষণের পরই উপস’াপন করছি।
ক. কেন এই প্রকল্প ঃ
বাংলাদেশ একটি দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশ। স্বভাবতই এদেশের সবার কাছে অর্থ একটি প্রধান আলোচ্য বিষয়। এ কারণেই আর্থিক স্বচ্ছলতা আনয়ন আমাদের স্কাউট কার্যক্রমের বাইরে নয়। এ সম্পর্কে বিস-ারিত এবং বাংলাদেশ স্কাউটস এর উদ্দেশ্য ও রূপরেখা সম্পর্কে “পারিবারিক জীবন শিক্ষা” পুস-কে আলোচিত হয়েছে। আমার উপস’াপিত প্রকল্পটিও এই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য থেকে কিছুমাত্র বিচ্যুত নয়। বিক্ষিপ্ত আলোচনা ছেড়ে আসুন, একটি আধুনিক পদ্ধতি মাফিক, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্প হিসেবে একে উপস’াপন করি। যার ফলে কাজটি সহজ হবে এবং আপনাদের কাছেও গ্রহণযোগ্য হবে।
প্রকল্পের শিরোনাম ঃ
“আধুনিক কবুতর পালন প্রকল্প ঃ
ব্যক্তিগত স্বনির্ভরতার উৎস”
প্রকল্পের অবস’ান ঃ
অবস’ান সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে স্বভাবতই কবুতরের বাসস’ানের কথা এসে পড়ে। তবে চিন-ার কিছু নেই। নিচে আলোচিত তিনটি বৈশিষ্ট্যের দিকে লক্ষ্য রেখে নিজের বাড়ির আশেপাশে তাকান, দেখবেন শহরে কিংবা মফস্বলে, রাজধানীতে কিংবা গ্রামে যেখানেই থাকুন না কেন, বাড়ির পেছনের একটি খোলা বারান্দায় বেলুকনির মত সুবিধাজনক জায়গা একটু জুটে গেছেই।
১. থাকার ঘরটা উঁচু জায়গায় করতে হবে, যাতে ক্ষতিকর প্রাণী ও পাখীদের নাগালের বাইরে থাকে।
২. প্রচুর আলো বাতাস আছে এমন স্বাস’্যকর জায়গা হতে হবে।
৩. কবুতরের মলত্যাগে যেন পারিবারিক সমস্যার সৃষ্টি না হয়।
প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ঃ
পূর্বেই বলা হয়েছে, আলোচ্য প্রকল্পটি বাংলাদেশ স্কাউটদের সমাজ উন্নয়ন ও ব্যক্তিগত আর্থিক স্বচ্ছলতা লাভের উদ্দেশ্যে প্রণীত। প্রকল্পটি বাস-বায়নে যে সব গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হাসিল হবে, তা হলো-
১. ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে উন্নতি ও স্বচ্ছলতা লাভ।
২. স্বনির্ভর প্রকল্প হিসেবে সমাজে এর প্রসারের মাধ্যমে আর্থিক ও নৈতিক উন্নয়ন সাধন।
৩. অবসর সময়ের অর্থবহ ব্যবহার ও আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন।
৪. সমাজ ও ব্যক্তিগত এবং জাতীয় জীবনে স্কাউট আন্দোলনের অবদান ও আবেদনকে আরও অর্থবহ করে তোলা।
৫. বসতবাড়িতে অল্প শ্রম, স্বল্প ব্যয়ে প্রকল্পটির মাধ্যমে পরিবারে আমিষের চাহিদা পূরণ পূর্বক বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি।
প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও সমস্যা চিহ্নিতকরণ ঃ
কিছু রাসভারী কথাবাতা না হয় হলো, কিন’ আসল কাজ করতে গেলে অবশ্যই যা আমাদের জানতে হবে তা হচ্ছে, কবুতর পালনের উল্লিখিত সেই আধুনিক পদ্ধতি সম্পর্কে।
তবে তার পূর্বে আর একটা প্রয়োজনীয় কাজ সেরে নেয়া যাক। যদিও এটি একটি ব্যক্তিগত প্রকল্প, এর সুষ্ঠু পরিচালনা ও বাস-বায়নের জন্য বাড়ির পরিবারের সদস্য ও স্কাউট লিডারকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করতে হবে।
প্রকল্প উপদেষ্টা ঃ নিজ দলের স্কাউট লিডার।
প্রকল্প পরিচালক ঃ প্রকল্পটি গ্রহণকারী স্কাউট।
সহায়তাকারী ঃ
১. বাবা-মা।
২. ভাইবোন ও অন্যান্য।
পরামর্শদাতা ঃ
১. থানা পশুসম্পদ কর্মকর্তা।
২. পশু চিকিৎসক।
সংগৃহীত তথ্য ঃ
একজোড়া কবুতর বারো মাস তেরোজোড়া বাচ্চা দেয়। আর এ কারণেই কবুতর পালন একটি লাভজনক প্রকল্প। রোগীর পথ্য ও বলকারক বলে এর বাজারও খুব ভালো।
কবুতরের বাসা তৈরি ঃ
বাজারে আপেল, আঙ্গুর প্রভৃতির পরিত্যক্ত প্যাকিং বাক্স কিংবা সস-া কাঠের সাহায্যে কবুতরের বাসা বানানো অতি সহজ। ১০ জোড়া কবুতরের জন্য এ রকম একটি ঘর বানাতে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা খরচ হতে পারে। তবে ঘর তৈরির সময় নিচের শর্তগুলো মেনে চললে সবোচ্চ সুবিধা পাওয়া যাবে ঃ
১. প্রতি জোড়া কবুতরের জন্য লম্বা ১২র্ র্ বা ৩০ সেঃ মিঃ চওড়ার ১র্২র্ বা ৩০ সেঃমিঃ এবং উচ্চতায় ১র্২র্ বা ৩০ সেঃ মিঃ মাপের খোপ বানাতে হবে।
২. কবুতরের ঘর পাশাপাশি বা কয়েক তলা বিশিষ্ট করা যেতে পারে। প্রতি তলায় র্৫র্ বা ১২.৭০ সেঃ বারান্দা এবং প্রতিটি খোপের জন্য র্৪র্ ক্ম র্৪র্ বা ১০.১৬ ক্ম ১০.১৬ সেঃমিঃ মাপের দরজা থাকবে।
৩. প্রতি মাসে ২/১ বার করে কবুতরের বিষ্ঠা পরিস্কার করতে হবে এবং এদের ঘর পরিস্কার ও শুকনো থাকা বাঞ্ছনীয়।
জীবনচক্র ঃ
সাধারণত পুরুষ ও স্ত্রী কবুতর জোড়া বেধে আজীবন এক সাথে বাস করে। এদের জীবনকাল ১২ থেকে ১৫ বছর। স্ত্রী-পুরুষ উভয়ে মিলে খড়কুটো সংগ্রহ করে ছোট জায়গায় বাসা তৈরি করে (ডিম পাড়ার স’ান)। ৫ থেকে ৬ মাস বয়সে স্ত্রী কবুতর ডিম পাড়া শুরু করে। এরা ২৮ দিন অন-র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে ২ (দুই)টি ডিম দেয় এবং পাঁচ বছর বয়স পর্যন- ডিমে বাচ্চা উৎপাদন ক্ষমতা সক্রিয় থাকে। ডিমে বাচ্চা উৎপাদন ক্ষমতা সক্রিয় থাকে। স্ত্রী-পুরুষ উভয়েই পালা করে ডিমে তা দেয়। ডিম থেকে বাচ্চা ফুটতে ১৭ থেকে ১৬ দিনের মধ্যে স্ত্রী ও পুরুষ উভয় কবুতরের খাদ্য থলিতে দুধ জাতীয় (ঈৎড়ঢ় গরষশ) বস’ তৈরি হয়, যা খেয়ে বাচ্চারা ৪ দিন পর্যন- বেঁচে থাকে। স্ত্রী ও পুরুষ কবুতর উভয়েই ১০ দিন পর্যন- এদের বাচ্চাকে ঠোঁট দিয়ে খাওয়াবার পর বাচ্চারা দানাদার খাদ্য খেতে আরম্ভ করে।
কবুতরের জাত ঃ
পৃথিবীতে দু’শ থেকে তিন’শ প্রজাতির কবুতর আছে। তবে যেহেতু আমাদের প্রকল্প মাংস উৎপাদী-বিক্রয় যোগ্য কবুতর উৎপাদনের লক্ষ্যে, সেহেতু আমরা গোলা, লক্ষা, ডাউকা কিংবা হামকাচ্চা জাতের সহজলভ্য যে কোন একটিকে বেছে নেব। অবস’া বিশেষে লোটন কিংবা গিরিবাজ জাতকেও বেছে নেয়া যেতে পারে, যদিও এরা চিত্তবিনোদনকারী কিছুটা মূল্যবান জাতের কবুতর।
পালনের সুবিধা ঃ
১. কবুতর পালন আনন্দদায়ক।
২. কবুতরের মাংস সুস্বাদু ও পুষ্টিকর।
৩. প্রতিমাসে গড়ে ২টি বাচ্চা পাওয়া যায় এবং ৩/৪ সপ্তাহে বিক্রয়যোগ্য খাওয়ার উপযোগীতে পরিণত হয়।
৪. এদের রোগ বালাই কম।
৫. খাবার খরচ কম এবং মুরগী পালনের চেয়ে সহজসাধ্য অর্থাৎ অল্প পুঁজি বেশী রুজি।
৬. থাকার ঘর তৈরি সহজ ও ব্যয়বহুল নয়।
৭. প্রকল্প গ্রহণযোগ্য প্রাপ্ত বয়স্ক দশজোড়া কবুতরের ক্রয় মূল্য প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা যে কোন প্রয়োজনে তা ক্রয় মূল্যে বিক্রয় করা যায়।
৮. ১০ জোড়া কবুতর থেকে গড়ে প্রতি মাসে ৮ জোড়া কবুতর পাওয়া যায়, যার বিক্রয় মূল্য কমপক্ষে ৩০০ টাকা।
খাদ্য ও প্রস’ত প্রণালী ঃ
প্রাপ্ত বয়স্ক প্রতিটি কবুতর গড়ে ৩৫ থেকে ৬০ গ্রাম দানাদার খাদ্য খায়। তবে স্বাস’্যবান কবুতর উৎপাদনের জন্য নিম্নের তালিকা অনুযায়ী ‘গ্রিট মিকচার’ তৈরি করে খাওয়াতে হবে ঃ
গ্রিট মিকচার
উপাদান পরিমাণ
১. গমভাঙ্গা ২. ভুট্টা ভাঙ্গা ৩. গমের ভূষি ৪. চাউলের কুড়া ৫. ধান ৬. পাঁচ মিশালী ডাল ৭. শুটকী/ পেরু ফিশ ৮. সয়াবিন/ বাদাম খৈল ৯. ঝিনুক চুর্ণ ১০. ভিটামিন ১১. ক. কাঠ কয়লা গুড়া খ. বালি গ. হাড়ের গুড়া ঘ. ডিমের খোসা গুড়া ঙ. শাক-সবজি ৩৫% ৫% ১০% ১০% ৫% ৫% ৩% ৫% ২% ১%
১০০%
এছাড়া বিশুদ্ধ খাবার পানির সু-বন্দোবস- থাকতে হবে।
রোগ বালাই ঃ
কবুতরের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য রোগ ও তার প্রতিকার-
রোগ ব্যাধি ঃ
রোগের নাম রোগের লক্ষণ প্রতিকারক টিকা/ ঔষধের নাম প্রয়োগের বয়স/ সময়
বসন- ত্বকের পালক বিহীন জায়গা ফোস্কা হয়, গলার ভেতরে ছোট ছোট ক্ষত হয়। পিজিয়ন পক্স ভ্যাকসিন ৪ সপ্তাহ বয়সে
কলেরা শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অরুচি, ওজন হ্রাস, শ্বাস কষ্ট, সবুজ বা হলুদ ডাইরিয়া ইত্যাদি সালফার পাউডার ট্যারামাইসিন ক্যাপসুল কসুমিক্স প্লাস রোগ দেখা দিলে রোগ দেখা দিলে
রক্ত আমাশয় বা ককসিডিওসিস কৃমি রোগ দুর্বলতা, শীর্ণতা, ফ্যাকাশে ভাব, ক্ষুধামমন্দা, রক্ত মিশ্রিত মল ত্যাগ ইত্যাদি। ক্ষুধা ও পিপাসা বৃদ্ধি, দুর্বলতা, রক্ত শূন্যতা, ডাইরিয়া, ওজন হ্রাস ইত্যাদি ই,এস,বি-৩ এমবাজিন ১. এভিপার, কুপেইন ইউনিভলন ইত্যাদি ২. মেবেন টেবলেট রোগ দেখা দিলে বা রোগের সম্ভাবনা থাকলে রোগ দেখা দিলে বা প্রতি ৩ মাস পর পর।
কবুতর অসুস’ হলে নিকটস’ পশু সম্পদ অফিসে যোগাযোগ করে পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
উপসংহার ঃ বন্ধুগণ, আমি আমার স্বল্প জ্ঞান ও সাধ্যের মধ্যে আন-রিকভাবে চেষ্টা করেছি, একটি বাস-ব সম্মত ও উপার্জনমুখী প্রকল্প আপনাদের সামনে হাজির করতে। কেউ যদি এই নিরস রচনা পড়ে সদিচ্ছাবশত প্রকল্পটি গ্রহণ করেন, তবেই আমার চেষ্টা সফল হবে। সবার সাফল্যের আশা নিয়ে শেষ করছি।




