হ্যাংগিং বাসকেট বা ঝুলন- ঝুড়িতে বাগান নিয়ে লেখাটা যখন শেষ করেছি, ঠিক তখনই আমাদের নটরডামিয়ান হারুন আমার সাথে ঝগড়া বাঁধালো অর্কিডের সম্পর্কে বিস-ারিত বলিনি কেন? কারণ এর জন্মানোর ব্যবস’াপনা তো ভিন্ন। অগত্যা আর একটা নতুন লেখার সূচনা। আলোচ্য বিষয়-অর্কিড।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আবহাওয়া ও জলবায়ু এবং সুযোগের দিক দিয়ে অর্কিড সামাজিক এবং বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে দামী ও দীর্ঘস’ায়ী ফুলের দিক দিয়ে অর্কিড একটি। বিশ্ববাজারে প্রধান রপ্তানীযোগ্য ফুলের বাজারে অর্কিড একটি। আমাদের দেশ থেকে রাশ্না মাতৃজাত নিয়ে গিয়ে বিদেশীরা কত কি করে ফেলল ও আর আমরা বাড়িতে একটা অর্কিডে ফুল ফোটাতে পারি না। একটা ঘটনা বলি, সিঙ্গাপুরে বেড়াতে গিয়ে আমার এক আত্মীয় একটা অর্কিড গাছ নিয়ে এলেন এবং ঝুলন- ঝুড়িতে লাগানোর উপযোগী অর্কিডটি তিনি যত্ন করে টবে মাটি দিয়ে লাগালেন। ব্যস, আর কি! কিছু দিন যেতেই পটল তুলল। এর আগে তিনি বৃক্ষমেলা থেকে কেনা ৫০০/- টাকা দামের অর্কিড মেরে নাম কামিয়েছেন। তার গাছের যত্ন নিতে তিনি তাই তার টাকায় আমার বাড়ি থেকে টেকনিশিয়ান (ইংরেজীতে বললাম, স্ট্যান্ডার্ড হয়, যেমন-ক্যারানিকে এখন বলে এক্সিকিউটিভ) আনেন। যাকগে সে কথা ২-৬ মাস যে গাছে একটা ফুল স’ায়ী হয়, তাতে ফুল ফোটাতে গিয়ে একটু কসাতে হবে (মানে- গোস- রান্না করতে যেমন-মসলাপাতি দিয়ে হেভি যত্নে ঘুটতে থাকে)।
তাহলে জেনে নিন-দুটো অর্কিড জন্মানোর পদ্ধতি-
১. ঝুলন- ঝুড়িতে অর্কিড
২. পাত্র/টবে অর্কিড
পদ্ধতি জানার পূর্বে একটু উদ্ভিদ বিদ্যা পড়ে নিন- (কাজে দেবে হুম! হুম!) অর্কিড- সে সকল উদ্ভিদ ঙৎপযরফধপপধব পরিবারের অন-র্গত, তাদেরকে অর্কিড বলে। এরা একবীজপত্রী ও বহুবর্ষজীবী। দামী ফুল ও কাটফ্লাওয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সিঙ্গাপুরের জাতীয় ফুল। বাংলাদেশের বড় গাছে বা আমের ডালে সুদৃশ্য ফুল সমৃদ্ধ।
শ্রেণীবিভাগ- (গাছ নির্বাচনের জন্য এর জ্ঞান থাকা জরুরী)।
জন্মানোর নিয়ামক
১। বায়ু প্রবাহ
দ্ব সাধারণ অর্কিড
দ্ব বায়বীয় গাছ
দ্ব মূলে পর্যাপ্ত বায়ু দরকার
দ্ব ঝুলন- ঝুড়ি বা ঝুরঝুরে গ্রোইং মিডিয়ায়ুক্ত ছিদ্রযুক্ত টবে জন্মে
২। সূর্যালোক
দ্ব পর্যাপ্ত সূর্যালোক-বিশেষত সকালের সূর্যালোক ফুলধারনের জন্য
দ্ব সরাসরি/ টানা সূর্যলোক ক্ষতিকর
দ্ব আধো আলো আধোছায়া (উরভভঁংবফ ঝঁহষরমযঃ) সবচেয়ে ভালো
৩। আর্দ্রতা ও জলীয় বাষ্প
দ্ব পানি ও খাবার কম লাগে-বাতাসে কিছুটা আর্দ্রতা দরকার।
দ্ব পানি দিলে সেপ্র করে বিটপ অংশে/ ওপরে দেওয়া ভালো।
দ্ব অতিরিক্ত পানি অত্যন- ক্ষতিকর।
দ্ব বৃষ্টির পানি সবচেয়ে ভালো-তাই বৃষ্টির পানি পাত্রে/ ড্রামে ধরে রাখা যেতে পারে।
দ্ব জবয়ঁরৎবফ যঁসরফরঃু
- গড়হড়ঢ়ড়ফরধষ-৭০-৭৫%
- ঝুসঢ়ড়ফরধষ-৪০-৪৫%
চংবফড়সড়হড়ঢ়রফরধষ-৬০-৬৫%
৪। ছায়া
দ্ব আধো আলো আধো ছায়া/
দ্ব অতিরিক্ত ছায়া ফুলের রং নষ্ট করে। এখন প্রশ্ন এত নিয়ামক পূরণ করবেন কিভাবে? খুব সহজ।
দ্ব বাড়িতে সকালে যে দিকটায় সূর্যের আলো পড়ে, কিন’ সারাদিন পড়ে না, সেদিক বেছে নিন।
দ্ব অথবা বাড়ির ছাদে কিংবা ব্যাকলনীতে বাঁশের চাচ (বসি-র ঘর বানায় যা দিয়ে) কিংবা গ্রামের খেজুর, নারকেল, সুপারী বা তালপাতা ও পাটকাঠি দিয়ে কিছুটা ফাঁকা ফাঁকা (জলিকা) করে চালা তৈরি করুন।
দ্বশুধু দো-চালা বা একচালা ছাদ দেবেন। বাকি চারদিক ফাঁকা/ কিংবা চাচ কিছুটা মাচার নিচে ঝুলন- লাউ-এর মত ছাদের নিচে ঝুলন- ঝুড়ি কিংবা টব।
দ্ব এই জিনিসটি বা সহজ প্রযুক্তিটিকে বলে অর্কিড হাউস বা ট্রপিকাল গ্রীন হাউজ।
বাংলাদেশে প্রেক্ষিতে অর্কিড জন্মানোর জন্য মাধ্যম তৈরি-
দ্ব নারকেলের ছোবড়া
দ্ব আম গাছের মৃত ছাল কিংবা আম কাঠের করাতের গুঁড়ো
দ্ব ঝামা ইট
দ্ব কয়লা
দ্ব মোটা বালি
দ্ব শুকনো গোবর এবং কিছু শুকনো মস (ভেজা দেয়ালে সবুজ হয়ে কার্পেটের মত জন্মে) ও ঢেঁকিশাকের শুকনো গোড়া বা শিকড়
দ্ব পাতা পচা ইত্যাদি
পাত্রে অর্কিড বাগান (ঈড়হঃধরহবৎ ঙৎপযরফ এধৎফবহরহম)
১। মাটির ছিদ্রযুক্ত বিশেষ টব-টেরিষ্টেরিয়াল অর্কিডের জন্য
২। ঝুলন- ঝুড়ি ইপফিাইটিক অর্কিডের জন্য
৩। আম গাছের ট্রাংক (ঞৎবব ঃৎঁহশ) ইপিফাইটিক অর্কিডের জন্য
ক. গাছ নির্বাচন
অর্কিড
বৃদ্ধির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বাসস’ানের ওপর ভিত্তি করে তাপমাত্রা ধারণ ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে

আনুভুমিক (ঝুসঢ়ড়ফরধষ) রাইজোম থেকে উৎপন্ন ভূমি সমান-রালে শুধুমাত্র পাশে বৃদ্ধি পায়। উলম্ব (গড়হড়ঢ়ড়ফরধষ) পরাশ্রয়ী অর্কিড (ঊঢ়ষঢ়ষুঃবং) * সাধারণত বড় গাছের কান্ড ও শাখায় জন্মে * বায়বীয় মূল থাকে ভূমিজ (ঞবৎৎবংঃবৎরধষ) গরম পছন্দকারী ঞবসঢ় ৬০০-৮০০ ঋ উষ্ণ জলবায়ু

ঊর্ধ্ব মুখী বৃদ্ধি * মাটিতে জন্মে * গুচ্ছমূলেল সাহায্যে মাটি থেকে খাদ্য নেয় পাথুরে অর্কিড (খরঃযড়ঢ়ষুঃবং) * মধ্যমধরনের তাপমাত্রা গরম পছন্দকারী অর্কিড * ঞবসঢ় ৫০০-৬০০ ঋ উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু

আনুভূমিক উলম্ব (চংবঁফড়সড়হড়ঢ়ড়ফরধষ) * মৃতজীবী (ঝধঢ়ৎড়ঢ়যুঃবং) পচনশীল বস’ ও জৈব পদার্থের ওপর জন্মে * ঠান্ডা পছন্দকারী অর্কিড ঞবসঢ় ৪০০-৫০০ ঋ উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু
দ্ব নার্সারী হতে
দ্ব প্রকৃতি হতে- গাছ/ আম গাছে দেশি ফুলওয়ালা রাশ্না।
দ্ব কিভাবে বাড়িতে লাগাবেন তা নির্ধারণ করবেন উপরের
দ্ব সামগ্রিক আলোচনার সারমর্ম থেকে
বাণিজ্যিক কিছু অর্কিডের নাম
- রাশ্না/ আম রাশ্না
- বাল্ব লিফ অর্কিড
- বি-অর্কিড
- ডেনড্রবিযাম
- মথ অর্কিড ইত্যাদি
খ. ঝুলন- ঝুড়িতে অর্কিড
দ্ব গাছ ও ঝুড়ি (বাঁশ, বেত কিংবা কাঠের তৈরি সাধারণ নার্সারীতে পাওয়া যায়) নির্বাচন করুন। নার্সারীতে ঝুড়ি না পেলে ছোট ছোট কাঠ দিয়ে চৌকোনো একটা বাক্স বানিয়ে নিন। তবে খেয়াল রাখবেন যেন-কংক্রিট ঢালাই এর পূর্বে যে রকম লোহার ফ্রেম করে ঐ রকম সামান্য ফাঁকা ফাঁকা করে জোড়া দেওয়া হতে হবে।
দ্ব বাঁশের তৈরি ছোট ঝুড়িও নেওয়া যেতে পারে।
দ্ব ঝুড়ির তলদেশে কিছু কয়রা/ ঝামা ইট দিয়ে নিন এবং পরবর্তীতে সমস-রে বাংলাদেশের জন্য উপযোগী মাধ্যম (মৎড়রিহম সবফরধষ) দিয়ে টব ঝুড়িটিকে ভরুন। একটি পরাশ্রয়ী অর্কিডের চারা ঝুড়িটিতে লাগান।
দ্ব সংগৃহীত বৃষ্টির পানি অথবা ইউরিয়া +ঞঝচ+গচ=১:১:১ষ ১ চা চামচ পরিমান ৫ (পাঁচ)লিটার বিশুদ্ধ পানিতে মিশিয়ে গাছে প্রয়োজন অনুযায়ী সেপ্র করতে হবে।
দ্ব গাছ লাগানোর পর ঝুড়ির গ্রোইং মিডিয়ার ওপর হাড়ের গুঁড়া সামান্য ছড়িয়ে দিতে হবে।
দ্ব সুদৃশ্য শিকায় ঝুলিয়ে দিন।
দ্ব গাছে ফুল আসার পর ফুল শুকিয়ে গেলে তার ইস্টিকসহ সাবধানে কেটে সরিয়ে ফেলতে হবে।
- ঝামা ইট-১/৪ ভাগ
গ্রোইং মিডিয়া- ১/৪ ভাগ
- মস+ফার্ণের গোড়ার শুকনো মিশ্রণ ১/৪ ভাগ (ড়ংসবহফধ+ সড়ংং)
-গ্রোইং মিডিয়া - ১/৪ ভাগ
গ. টবে অর্কিড চাষ-
দ্ব অর্কিড চাষের জন্য উপযোগী টব এখন বাজারে কিনতে পাওয়া যায়।
দ্ব টেরিষ্টেরিয়াল অর্কিডের জাত নির্বাচন করুন।
দ্ব বিশেষ ধরনের মাটি এভাবে তৈরি করুন-
১. হিউমাস-২ ভাগ
২. পাতা পঁচা- ২ ভাগ
৩. গোবর- ১ ভাগ
৪. মস+ফার্ণের গোড়া ও শিকড়- ১ভাগ
দ্ব মাটি সাজানো পূর্বের নিয়ম অনুযায়ী (ঝুলন- ঝুড়িতে দৃষ্টব্য) টবে মাটি সাজান
দ্ব গাছ রোপণ করুন
মোটামুটি এই হলো অর্কিড চাষের ইতিকথা। তবে লেখা শেষে মনে হলো, লেখাটিকে প্রকল্প হিসেবে দেয়া যেতে পারত। কারণ ক্রমশই ফুলের দোকানগুলোতে অর্কিডের সরবরাহ ও কদর বাড়ছে। তাই স্কাউটরা ইচ্ছা করলেই ছাদে ব্রয়লার মুরগী কিংবা টবে গোলাপের পরিবর্তে একটা অর্কিড হাউস বানিয়ে সহজেই অর্কিডের চাষ করতে পারে। যা বাংলাদেশ সরকারের যুব উন্নয়নে গৃহীত নীতিমালারও কার্যক্রম হিসেবে পরিগণিত হবে। ভারত, সিঙ্গাপুরের সাধারণ মানুষরা পারলে আমরা কেন পারব না? আমরা কি সমৃদ্ধ জাতি নই! নাকি স্কাউট প্রতিজ্ঞার আল্লাহ ও আমার দেশের প্রতি কর্তব্য পালনের কথাটি খাতা কলমেই রেখে দেব।
সবার সাফল্য কামনা করি, আর ভুলত্রুটি ও সীমাবদ্ধতাকে (সবদিকে) ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে আজ্ঞা হয়।

Leave a Reply

You can use these tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>