পৃথিবীর সব কিছু ভূপৃষ্ঠ থেকে ওজোন স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত পরিমন্ডলে বিদ্যমান আলো, বাতাস, পানি, শব্দ, মাটি, পাহাড়, নদ-নদী সাগর, মানুষ নির্মিত অবকাঠামো, রাসায়নিক পদার্থ এবং গোটা উদ্ভিদ ও জীব জগতের সমন্বয়ে যা সৃষ্ট তাই পরিবেশ। এই পরিবেশের অংশ মানুষ পরিবেশ থেকে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করেই বেঁচে আছে। পরিবেশ মানুষের জন্য প্রধানত মৌলিক তিনটি কাজ করে। প্রথমত, বাতাসসহ মানুষের থাকার জায়গা দেয় এবং সেই সব আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র সরবরাহ করে, যা মানুষের জীবনকে গুণগতভাবে সমৃদ্ধ করে। দ্বিতীয়ত, পরিবেশন হচ্ছে কৃষি, খনিজ, পানি এবং অন্যান্য সম্পদের উৎস, যা মানুষের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অপরিহার্য। তৃতীয়ত, পরিবেশ মানুষ সৃষ্ট সব আবর্জনা গ্রহণকারী হিসেবে কাজ করে এবং এভাবেই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে।
মানুষের অর্থনৈতিক তৎপরতা প্রকৃতিকে জয় করার অংশ হিসেবে জৈব পরিমন্ডলের ওপর প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়ার চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে। বিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নজিরবিহীন উদ্ভাবন পরিবেশকে দূষিত করছে। শিল্প ও অন্যান্য বর্জ্য পরিশোধনের ক্ষমতা প্রকৃতি প্রায় হারাবার পথে।
আমাদের লেখার সুচনাতে এই কথাগুলো বলার একটিই কারণ। কবি নাকি বলেছিলেন ‘মরিতে চাহি না আমি এ সুন্দর ভুবনে।’ কিন’ চিন্তা করুন তো আমার স্কাউট ভাইবোনেরা, আদৌ কি ভুবন সুন্দর আছে না থাকছে। গ্রীন হাউস প্রতিক্রিয়া, বাতাসে অক্সিজেন ঘাটতি ইত্যাদি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আমরা যখন চিন-া করছি, তা ঠেকাবার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস’া (যেমন বৃক্ষরোপণ কর্মসূচী) গ্রহণ করেছি, ঠিক তখনই কিছুটা গৌণ হলেও অতি ভয়াবহ একটি জিনিস অতি সূক্ষ্মভাবে আমাদের চোখকে ফাঁকি দিচ্ছে, ঠিক কোর্টে বিজ্ঞ উকিলের চাতুরীপূর্ণ জেরার মাধ্যমে। আর সেই জিনিসটি হচ্ছে প্লাস্টিক। পূর্বের লাইনে ব্যঙ্গাত্মক উদাহরণ দেবার কারণ আমরা বৃক্ষরোপণ সপ্তাহ পালন করি, ধূমপানমুক্ত দিবস পালন করি কিন’ প্লাস্টিক (পলিব্যাগ) মু্ক্ত দিবস পালন করি না। প্লাস্টিকের ভয়াবহতা সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে আসুন জেনে নেয়া যাক-প্লাস্টিক কি? এবং কিভাবে তা বাংলাদেশে ব্যবহৃত হচ্ছে?
আমরা যারা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী আছি তারা জানি, একটি রাসায়নিক প্রক্রিয়ার কথা যাকে পলিমারইজেশন বা পলিমারকরণ বলে। যে প্রক্রিয়ায় এই একই ধরনের অনু (পদার্থের ক্ষুদ্র উপাদান) পরস্পর যুক্ত হয়ে অপর একটি বড় অনু উৎপন্ন করে তাকে পলিমারকরণ বলে। রসায়নের হা্ইড্রোকার্বণ গ্রুপের সরলতম সদস্য ইথিন বা ইথিলিন দু’টি কার্বন পরমাণু (পদার্থের অতি ক্ষুদ্রতম কণা) চারটি হাইড্রোজেন পরমাণুর সমন্বয়ে গঠিত ও প্রতিটি কার্বন পরমাণুর শেষ গোলকে ৭টি ইলেকট্রন আছে। তাই কার্বন পরমাণুগুলো আটটি ইলেকট্রনের পূর্ণখোলক লাভ করার জন্য ২টি কার্বণ পরমাণুর মধ্যে ২টি ইলেকট্রনীয় বন্ধনের সৃষ্টি করে থাকে যাকে দ্বিবন্ধন বলে, এই ইথিন অণুকে হাইড্রোজেন সহযোগে উত্তপ্ত করলে (২০০০ ) উচ্চ তাপে ও উচ্চ চাপে ইথিন পরস্পর সজ্জিত হয়ে এর লম্বা শেকল তৈরি করে- ইটিই পলিথিন বা প্লাস্টিক। উপরোক্ত প্রক্রিয়ায় তাপ ও চাপের পরিমাণ হ্রাস-বৃদ্ধি ও বিভিন্ন রাসায়নিক অনুঘটক যোগ করে বিভিন্ন রকম প্লাস্টিক পাওয়া যায়।
উন্নত বিশ্বের দেশগুলো যখন শতকরা ৩৩.৩ ভাগ হারে বছরে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে দিচ্ছে, তখন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে বাড়ছে তা প্রায় দ্বিগুণ হারে। আমরা যে উন্নতি ছেড়ে অবনতির দিকে যাচ্ছি, তার একটি প্রকৃষ্ট প্রমাণ এই প্লাস্টিকের ব্যবহার। উন্নত বিশ্বে এখন আর কেউ প্লাস্টিক সপিং ব্যাগ ব্যবহার করে না। ব্যবহার করে করে বড় কাগজের প্যাকেট। আর আমরা তাদেরই ত্যাগ করা করা ক্ষতিকারক প্যাকেট। আর আমরা তাদেরই ত্যাগ করা ক্ষতিকারক প্লাস্টিককে বাজার করার ফ্যাশন হিসেবে ব্যবহার করি। আমরা না কি দেখেই শিখি। কিন’ ইংরেজী কমেডি সিরিজগুলোতে যখন দেখায় বড় একটা কাগজের ঠোংগা হাতে নিয়ে অভিনেতারা বাজার করে ফিরলেন, তখন তা থেকে আমরা কি শিখি? প্লাস্টিকের ব্যবহার না ত্যাগ?
মূলত উন্নত বিশ্ব প্লাস্টিক ত্যাগ করা আরম্ভ করলে অর্থাৎ আশির দশকে বাংলাদেশে প্লাস্টিকে ও প্লাস্টিক ব্যাগের বহন প্রচলন শুরু হতে থাকে। সরকারী হিসেব মতে ঢাকা শহরেই প্রায় ১৫-২০টি প্লাস্টিক ব্যাগ উৎপাদনকারী কারখানা রয়েছে এবং এদের দৈনিক সম্মিলিত উৎপাদন ৬০-৭০ লাখ পলিথিন ব্যাগ। মূলত শহর এলাকায় এর ব্যবহার হলেও ইদানীং গ্রামেও বহুল প্রচলন হয়েছে। এখন বাজার করলে বা কিছু কিনলে বিক্রেতা ক্রেতাকে প্লাস্টিক ব্যাগ এমনিই দিয়ে দেয়। ফলে কিনতে হয় না। ঘরে নিয়ে আসার পর সাময়িক কাজটি শেষ হলে এ ব্যাগই জানালা দিয়ে বা ডাস্টবিনে ময়লার সাথে ফেলে দেয়া হয়। কাঁচ, এলুমিনিয়াম বা লৌহ নির্মিত সামগ্রীর স’ান দখল করে নিচ্ছে প্লাস্টিক। যার বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কথা আমি পরে আলোচনা করছি। এখন দেখা যাক কেন প্লাস্টিক এত জনপ্রিয় বা এর ব্যবাহরের সুবিধা কি?
১। অধিকাংশ রাসায়নিক দ্রব্যের সাথে বিক্রিয়া করে না।
২। ঘনত্ব কম হওয়ায় পরিবহন খরচ কম।
৩। প্লাস্টিকের তৈরি তৈজসপত্র আকার-আকৃতিতে ঠিক থাকে।
৪। দামে সস-া, ওজনে হালকা, দেখতে সুন্দর ও অল্প জায়গা নেয় ইত্যাদি।
এবার প্লাস্টিকের ব্যবহার ও প্রকৃতিতে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া বা অসুবিধাসমূহ দেখা যাক-
১। প্লাস্টিকের এমন একটি জিনিস যা পচে না অর্থাৎ মাটি বা পানিতে মিশে যায় না। আর এর অসুবিধার প্রধান কারণ এটাই।
২। ঘন বসতিপূর্ণ বাংলাদেশের শহর এলাকার পয়ঃ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস’া এমনিতেই ত্রুটিপূর্ণ। প্লাস্টিক ব্যাগ এ সমস্যাকে আরও তীব্র করে তুলছে। আশংকা করা হচ্ছে প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার বন্ধ না করলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তা ঢাকাসহ কয়েকটি শহরের নালা, নর্দমা, সুয়ারেজ-ড্রেন ইত্যাদি বন্ধ করে দিয়ে ভয়াবহ সমস্যার সৃষ্টি করবে।
৩। প্লাস্টিক ক্ষয় হয় না। প্লাস্টিক উৎপাদনকালে পুরো পলিমারাইজেশন হয় না এবং বিভিন্ন রকম মনোমারিক ভিনাইল ক্লোরাইড উৎপন্ন হয়। এই বিষাক্ত পদার্থগুলো অবশ্যই কারখানা শ্রমিকদের ‘ক্যান্সার’ ও অন্যান্য ভয়াবহ জটিল রোগের সৃষ্টি করে।
৪। প্লাষ্টিক মাটির জন্য অত্যন- ক্ষতিকর। মাটির উপকারী ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলে এবং সূর্যালোক মাটিতে পৌছাতে দেয় না। ফসলের জমিতে পলিথিন জাতীয় ব্যাগ বা অন্যান্য সামগ্রী মিশে তার উর্বরতা কমিয়ে দেয়। কারণ ‘পচনশীল নয়’ প্লাস্টিক মাটির যে স্তরে চাপা পড়ে বা অবস্থান করে, শত বছরও সে সেভাবেই থাকে। যার ফলে সে মাটির উপরের স-রের সাথে নিচের স্তরের যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়ে তার বুনটের পরিবর্তন ঘটিয়ে উর্বরতা নষ্ট করে এবং মাটিতে প্লাস্টিক থাকলে উদ্ভিদের মূলের বৃদ্ধি ঘটে না।
৫। প্লাস্টিক ব্যাগে ময়লা ফেলা আমাদের নিত্যনৈমেত্তিক ফ্যাশন। কিন’ আমরা কি জানি যদি এই ময়লা দিয়ে কোন নিচু স’ান ভরাট করা হয় (যেমন- গাবতলী বাস স্ট্যান্ড) কিংবা পানিতে ফেলা হয় তাহলে সেই জায়গায় স-র বিন্যাস (মাটির) হবে না, আবর্জনা ঠিকমত না পচে রোগ জীবাণুর সৃষ্টি করবে এবং সেখানে যদি উঁচু কোন ইমারত নির্মাণ করা হয় তাহলে তা ধসে পড়বে। এ রকম একটি ঘটনা থাইল্যান্ডে ঘটেছে। আমেরিকার সরকার এ রকম ময়লা দ্বারা ভরাটকৃত প্রায় ১০০টি স’ান বসবাস ও ব্যবহারের অযোগ্য ঘোষণা করেছে। আর পানিতে ফেলা হলে এর ভেতরের ময়লার জৈবিক ক্রিয়া সংঘটিত হতে না পেরে তাতে বিষাক্ত পদার্থ ও জীবাণুর সৃষ্টি হবে যার ফলে ঘটবে পানি দূষণ।
৬। গবেষকরা বলছেন, প্লাস্টিকে করে মাংস, মাছ, তরকারি অনেকদিন ফ্রিজে রেখে দিলে তা থেকে ক্যান্সারের জীবাণু তৈরি হতে পারে। এমন কি প্লাস্টিক মোড়কের খাবার খাওয়ার উচিত নয়। প্লাস্টিকের গায়ে খুব সহজেই রোগ জীবাণুর বীজ লেগে থাকতে পারে, যা খুব সহজে তাতে রাখা খাবারে চলে যায়।
৭। প্লাস্টিক পোড়াতে যথেষ্ট শক্তির দরকার হয় এবং তা পোড়ালে হাইড্রোজেন সায়ানাইড ও বিভিন্ন ক্ষতিকারক গ্যাসের সৃষ্টি হয়। হাইড্রোজেন সায়ানাইড মানুষের (জীবের) দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে এবং চর্ম রোগের (যেমন: স্থায়ী ঘামাচি) সৃষ্টি করে।
৮। বাংলাদেশের প্রায় এলাকায় এক ধরনের প্লাস্টিক (নাইলন) জাল দিয়ে মাছ ধরা হয়। এতে মাছের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পায়।
৯। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত উন্নত দেশে সমুদ্র উপকুলে পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের কারণে বছরে ১ লাখ প্রাণী ও ১ লাখ সামুদ্রিক প্রাণী মারা যাচ্ছে।
১০। এ ছাড়াও প্লাস্টিকের বিপক্ষে ও এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সম্বন্ধে আরো অনেক যুক্তি দাঁড় করানো যাবে।
আশার কথা, আমাদের দেশের সরকার এ ব্যাপারটি উপলব্ধি করে ভবিষ্যতে ব্যাগ উৎপাদন বন্ধের ব্যবস’া গ্রহণ করেছেন এবং আর যাতে কোন প্লাস্টিক ও প্লাস্টিক ব্যাগ উৎপাদনকারীর পক্ষে এই কাজ সম্পাদন করা কষ্টসাধ্য, তাই সাধারণেরও এগিয়ে আসতে হবে। কারণ পরিবেশ মানে প্রাকৃতিক সম্পদের বিচক্ষণ ব্যবহার। তাই পরিবেশ সংরক্ষণ ও পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সংকীর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার কোন অবকাশ নেই। তাই স্কাউট প্রোগ্রাম ও আমাদের দলীয় স্কাউট কার্যক্রমের পরিকল্পনায়ও এ ব্যাপারে সুবিবেচনাপ্রসূত, সরাসরি চিন-া-ভাবনা ও কার্যক্রমের প্রতিফলন ঘটানো অত্যন- জরুরী।
শেষ হয়েও শেষ করা গেল না লেখা। তাই আরও কিছু কথা। স্কাউট বন্ধুরা, আমরা স্কাউটিং করি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য। কিছুকাল আগেও আমরা বাজার করতে যেতাম ঐতিহ্যবাহী পাটের ব্যাগ নিয়ে। দোকান থেকে কিছু কিনলে কাগজের ঠোংগা দেয়া হতো। কিন’ আধুনিকতার নামে আমরা সুফলা বাঙলাকে অনুর্বর মরুভূমিতে পরিণত করতে পার? হে আত্মমর্যাদায় বিশ্বাসী বিবেকবান স্কাউটরা, আপনাদের কি একটুও এ বিষয়ে চিন-া হয় না। যদি চিন-া হয় তবে আজ থেকেই শপথ নিন “আর প্লাস্টিক নয়, সেই পাটের ব্যাগ চাই।” যদি নিতে পারেন, স্কাউট আন্দোলনের লাখ লাখ সদস্যের জন্য তাহলে অন-ত লাখ খানের প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যবহার আর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাংলাদেশ বেঁচে যাবে। এটাই কি আমাদের জন্য চরম পাওয়া নয়।