পৃথিবী সৌরজগতের একমাত্র গ্রহ। সেখানে জীব বাস করতে পারে। আর এই জীবই হচ্ছি আমরা মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদ কুল। কিন’ মানুষ তার অনেক অবিবেচনা প্রসূত কাজের মাধ্যমে পরিবেশকে ধ্বংস করে চলেছে এবং পৃথিবীকে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলছে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ তা তার নিজের অজানে-ই করে চলেছে।
পৃথিবীর সব কিছু, ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ওজোন স-র পর্যন- বিস-ৃত পরিমন্ডলে বিদ্যমান আলো, পানি, শব্দ, মাটি, বন, পাহাড়, নদ-নদী, সাগর এবং সর্বোপরি মানুষ ও জীব জগতের সমন্বয়ে যা সৃষ্টি তাই পরিবেশ। সুতরাং পরিবেশ দূষিত এবং ধ্বংস হওয়া মানেই পৃথিবীর ধ্বংস বা দূষিত হওয়া। যেহেতু মানুষই এই পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী, সেহেতু একমাত্র মানুষই পারে এই দূষণকে বন্ধ করে একটি সুস’, সুন্দর ও দুষণমুক্ত পৃথিবী তৈরি করতে। স্কাউটরা এ কাজটি অত্যন- সহজভাবে করতে পারে। কারণ স্কাউটিং একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠাতা স্যার ব্যাডেন পাওয়েল বলেছেন, “পৃথিবীকে যেভাবে পেয়েছ তার চেয়ে আর একটু উন্নত করে রেখে যাবার চেষ্টা কর।”
বর্তমানে আমরা যে পৃথিবীকে পেয়েছি তা তার বিভিন্ন দুষণের কারণে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা আমাদের নৈতিক, সামাজিক এবং স্কাউট দায়িত্ব। আমাদের এ পৃথিবী বিভিন্ন উপায়ে দূষিত হচ্ছে। আমরা মাটি, পানি, বাতাস প্রভৃতিকে দূষিত করছি। যা দিয়ে পরিবেশ তৈরি। পরিবেশ তিন ধরনের উপাদান সমন্বয়ে গঠিত- হস-, শক্তি এবং অবস’া। এই উপাদানগুলোর মধ্যে কিছু পারস্পরিক সম্পর্ক কাজ করে। যদি কোন কারণে এই সম্পর্কে ছেদ পড়ে তাহরে পরিবেশে দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা। একটি ছোট উদাহরণের মাধ্যমে ব্যাপারটিকে পরিস্কার করা যেতে পারে। ধরা যাক একজন চাষীর কথা, যিনি জমি চাষ করেন, ফসল ফলান তা থেকে জীবন ধারণের জন্য খাদ্য পান এবং কিছু বিক্রি করে নিত্য ব্যবহার্য জিনিস পত্র কেনেন। এক কথায় তার ফসলী জমিই তার জীবন ধারনের উপাদান। এখন যদি কোন কারণে চাষী জমি চাষ করা বন্ধ করে দেন, সেচ দেয়া বন্ধ করে দেন তাহলে কি তিনি সে জমি থেকে তার জীবন ধারণের ফসল পাবেন? এতো গেল চাষী অর্থাৎ মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে জীবন ধারণের জন্য বিদ্যমান একটি খাদ্য শৃঙ্খল কথা যা মানুষ ও প্রকৃতি তাদের পারস্পরিক নির্ভরশীলতার মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন। পরিবেশে এ ধরনের হাজার হাজার শৃঙ্খল বিরাজমান। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য পরিবেশের মধ্যে বিদ্যমান চক্র বা শৃঙ্খলগুলোকে সি’তিশীল রাখতে হবে। তবেই আমরা একটি নির্মল পরিবেশ তথা পৃথিবী সৃষ্টির মাধ্যমে একটি সুন্দর ও সুস’ জীবন যাপন করতে পারব।
পরিবেশ সংরক্ষণ একটি অত্যন- গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হয়ে দেখা দিয়েছে। সেজন্য বিশ্বের প্রতিটি দেশের স্কাউট প্রোগ্রামে পরিবেশ সংরক্ষণ ও পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষার জন্য কিছু না কিছু প্রোগ্রাম আছে। যেমনঃ বাংলাদেশে স্কাউটরা পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধকরণ, বৃক্ষ রোপন, জনসংখ্যা বৃদ্ধিরোধ প্রভৃতি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ ও অষ্ট্রেলিয়ান স্কাউট এসোসিয়েশন যৌথ সহােগিতায় ‘বাক’ প্রজেক্ট গড়ে তুলেছে। নিঃসন্দেহে তা প্রশংসার দাবী রাখে। সিঙ্গাপুর স্কাউট এসোসিয়েশন তাদের পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযানের অংশ হিসেবে ‘পেপার রিসাইক্লিং’ প্রোজেক্ট গ্রহণ করেছে।
আমার প্রিয় পাঠকবৃন্দ আপনারা নিশ্চয়ই এখন আমার এই প্রবন্ধের নামের অপর অংশ অর্থাৎ ওয়ার্ল্ড স্কাউট এনভায়রনমেন্ট ‘নেটওয়ার্ক’ সম্পর্কে জানতে চান এবং নিশ্চয় আপনাদের মনে এ ‘নেটওয়ার্ক’ সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন জেগেছে। যেমন, এ নেটওয়ার্ক এর কাজ কি? এ নেটওয়ার্ক কোথায় অবসি’ত? কেই বা নেটওয়ার্ক পরিচালনার দায়িত্বে আছেন? ইত্যাদি ইত্যাদি। যাই হোক এবার আমি এ নেটওয়ার্ক সম্পর্কে কিছু উপস’াপন করার চেষ্টা করব।
সদ্য সমাপ্ত জাপানের একটিস্কাউট প্রোগ্রাম এর পূর্বে এ নেটওয়ার্ক সম্পর্কে আমার অবস’া ছিল ঠিক এখন আপনাদের যে অবস’া, সে রকম। যাইহোক এ বছর নিপ্পন ইনভাইটেশন প্রোগ্রামে যোগদানের জন্য আমি জাপান গিয়েছিলাম। এ প্রোগ্রামের অত্যন- গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান বিষয় ছিল যেটি, সেটি হলো প্রথম এশিয়া প্যাসিফিক এনভায়রনমেন্টাল কনজারভেশন ওরিয়েন্টেড ক্যাম্প (ঊপড় ক্যাম্প)। জাপানের কিউসু দ্বীপের জাপানী ন্যাশনাল পার্কের কাছে কুজু পাহাড়ের পাদদেশে ৪-৮ই আগষ্ট অনুষ্ঠিত হয় এ ক্যাম্প। ৪ তারিখ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এপি রিজিওনের ট্রেনিং এক্সিকিউটিভ মিঃ গোলাম সাত্তার আমাদের উদ্দেশ্যে তার বক্তৃতার এক স’ানে এই নেটওয়ার্কের কথা উল্লেখ করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর আমি সাত্তার স্যারকে অনুরোধ করলাম আমাকে এ সম্পর্কে বিশদভাবে বলতে? কারণ,কেন জানি না আমার এতই আগ্রহ জন্মে গিয়েছিল। যাই হোক স্যার আমাকে নিরাশ করলেন না। তিনি বললেন যে, কাল সকালে পল আসবে তার কাছ থেকে জেনে নিও। তখন স্যারকে সবিস্ময়ে আবার প্রশ্ন করলাম, স্যার, এই মিঃ পল ব্যক্তিটি কে? সঙ্গে সঙ্গে উত্তর-পল হচ্ছে এই এনভায়রনমেন্ট নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী বা কো-অর্ডিনেটর। আমার আগ্রহ আরও বেড়ে গেল। পরদিন পলের সাথে দেখা হলো। আমাদের পাশেই অনুষ্ঠিত হচ্ছিল যে কাব ক্যাম্পুরী তার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। সে সবে মাত্র এসে পৌঁছেছে মাউন্ট কুজুর আমাদের ইকো ক্যাম্পে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে। এখানে আসার আগে সে ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্ব কমডেকায় যোগদান করেছে এবং সেখান থেকেই আসছে। সে খুব ক্লান- ছিল। তাই সেদিন আমি শুধু আমার পরিচয় দানের মাধ্যমেই তার সাথে মিলিত হলাম। পরের দিন সকালে আমাদের ক্যাম্প প্রোগ্রাম ‘নেচার কনজারভেশনে’ যোগদান করতে গিয়ে পলের সাথে দেখা। গল্পও হলো কিছুটা এবং তখনই আমি প্রশ্ন করলাম তার এই নেটয়ার্ক সম্পর্কে। সে আমাকে বিশদভাবে জানালো-এর কাজ কি? কেন তৈরি? ইত্যাদি ইত্যাদি। তার কাছ থেকে জানা এই নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তথ্যগুলো ছিল এ রকম ঃ-
“ওয়ার্ল্ড’ স্কাউট সংস’া পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য ও অন্যান্য কিছু পরিবেশ সংরক্ষণকারী সংস’ার সাহায্য ও সহযোগিতার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। ওয়াল্ড স্কাউট এনভায়রনমেন্ট নেটওয়ার্ক হলো পরিবেশ সংরক্ষণে-বিশ্ব স্কাউট সংস’ার একটি সাহায্যকারী সংগঠন, যার কাজ ঃ-
(১) পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে স্কাউটদের সচেতন করে তোলা।
(২) পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কে বিভিন্ন দেশের স্কাউটদের নেওয়া প্রকল্প ও কর্মসূচী সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ।
(৩) বিভিন্ন দেশের স্কাউটদের ভিতর পরিবেশন সংরক্ষণ সম্পর্কে খবরা খবর, তত্ত্ব ও তথ্যের আদান-প্রদান নিশ্চিত করা।
(৪) পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ সরবরাহ করা এবং যে কোন প্রকার সাহায্য ও সহযোগিতা করা ইত্যাদি।
এ কাজগুলো সম্পন্ন করার জন্য ‘পল’ প্রথমে সকল দেশে তার নেটওয়ার্কের একটি শাখা খুলতে চায়, যা সেই দেশের ভিতর এই নেটওয়ার্কের কাজ চালিয়ে যাবে। এটি একটি নতুন সংস’া। তাই পল আমাকে বলেছিল দেশে ফেরার পর আমাদের জাতীয় স্কাউট সংস’ার সাথে আলোচনার মাধ্যমে একটি নেটওয়ার্ক খুলতে এবং অবশ্যই তার সাথে যোগাযোগ রাখতে। আমরা কিভাবে এ নেটওয়ার্কে কাজ করব তার একটি পরিকল্পনাও তিনি আমাদেরকে দিয়েছেন।
এ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, স্কাউট কিংবা স্কাউট দল পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য যে প্রকল্প বা কাজটি করবে সে তথ্য সে তার জাতীয় নেটওয়ার্ককে জানাবে এবং এ প্রকল্পে কোন রূপ সাহায্যের দরকার হলেও তার জন্য তার জাতীয় নেটওয়ার্ককে বলবে। যেমন ধরা যাক, কোন স্কাউট কিংবা স্কাউট দল বৃক্ষরোপনের উপর একটা প্রকল্প হাতে নিল। তার বৃক্ষরোপন সম্পর্কে কি তথ্যের দরকার যেমনঃ- কিভাবে গাছ লাগায়? কখন গাছ গালায়? কোথায় কোন গাছ লাগাতে হয়? ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব তথ্য অতি সহজে সে জেনে নিতে পারবে এই নেটওয়ার্ক থেকে। যদি এ ধরনের কোন প্রশ্নের জবাব বা কোন তথ্য জাতীয় পরিবেশ নেটওয়ার্কের কাছে না থাকে, তখন নেটওয়ার্ক ওয়ার্ল্ড স্কাউট এনভায়রমেন্ট নেটওয়ার্ক অর্থাৎ পল ক্যাপারের সাথে যোগাযোগ করবে। এছাড়াও এক স্কাউট দেশের সংস’া অন্য দেশের স্কাউট সংস’ার পরিবেশ নেটওয়ার্কের সাথে যোগাযোগ করবে এবং পরিবেশ সংরক্ষণে একে অপরকে সহায়তা করবে। এছাড়াও খুব তাড়াতাড়ি এপি রিজিওন থেকে প্রকাশিত স্কাউট পত্রিকায় অতিরিক্ত আরও একটি পাতা সংযোজন করা হচ্ছে, যেখানে সদস্য দেশগুলোর জাতীয় পরিবেশ সংরক্ষণ নেটওয়ার্ক থেকে পাঠানো তথ্য ও খবরা-খবর তথা সে দেশের স্কাউট ও স্কাউট দলসমূহ কর্তৃক গৃহীত প্রকল্পের খবরাখবর ছাপানো হবে। কোন স্কাউটের যদি পরিবেশ সংরক্ষণের উপর কোনরূপ মতামত কিংবা সুপারিশ থাকে, তাও সে এই নেটওয়ার্ককে প্রদান করতে পারবে এবং তা নেটওয়ার্ক বিচার বিবেচনা করে দেখবে। এটি একটি অত্যন- গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সে জন্য এর দায়িত্বে যিনি থাকবেন তাকে অবশ্যই পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন, দক্ষ ও অভিজ্ঞ ও পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কে সচেতন কিছু বয় স্কাউট ও রোভার স্কাউটকে নির্বাচিত করবেন। প্রতিটি দেশের সাংগঠনিক কাঠামোর সর্বনিম্নস-র পর্যন- এই নেটওয়ার্ককে সমপ্রসারিত করতে হবে এবং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। তবেই আমরা স্কাউট হিসেবে পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারব।
প্রিয় পাঠক বন্ধুগণ, এই সবই হচ্ছে পলের কথা। সে আমাদেরকে পরিবেশ সংরক্ষণের উপর এশিয়া প্যাসিফিক রিজিওনের প্রথম ক্যাম্পের প্রতিটি কাজে সাহায্য করেছে, উৎসাহ যুগিয়েছে, পরামর্শ প্রদান করেছে। তার কাছ থেকে এই নেটওয়ার্ক সম্পর্কে আমি এটুকুই জেনেছি। তবে আমি প্রশ্ন করেছিলাম, পল প্রতিটি দেশে তো তোমার নেটওয়ার্কের শাখা এখনও হয়নি। তাহলে কিভাবে আমি তোমার সাথে যোগাযোগ করব। প্রতি উত্তরে সে তার ঠিকানা দিয়ে বলেছিল- এখন এই ঠিকানাতেই সরাসরি কর, পরে দেখা যাবে, কি করা যায়।
কিন’ বন্ধুগণ আমি একজন ক্ষুদ্র স্কাউট হিসেবে তার কাজ থেকে এটুকুই জানতে পেরেছি এবং আরও জানার জন্য তার সঙ্গে যোগাযোগ করছি। তবে পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য আমাদের যা কিছু করতে হবে, তা এখনই জরুরী ভিত্তিতে অতিসত্ত্বর করতে হবে। তা না হলে আর সময় থাকবে না। সেজন্য প্রতিটি দেশে অবশ্যই এ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। আমাদের শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশেও মানুষ তাদের দেশের জন্য অত্যন- প্রয়োজনীয় বনভূমিকে ধ্বংস করে এক মারাত্মক পরিসি’তির উদ্ভব ঘটিয়েছে। যার প্রমাণ আমরা পাচ্ছি ঝড়ে, সাইক্লোনে, বন্যায়। এর জন্য নিতে হবে এমন প্রকল্প যা দেশকে রক্ষা করবে, সচেতন করবে মানুষকে তার পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কে। তা না হলে স্কাউট হিসেবে আমরা কখনই আদর্শ নাগরিক হতে পারব না। এ প্রসঙ্গে একজন প্রকৃতি বিজ্ঞানী যথার্থই বলেছেন- যে ব্যক্তি দেশ ও দেশের রাজনৈতিক অবস’া সম্বন্ধে সচেতন নন, তিনি যেমন একজন প্রকৃত ভোটার হতে পারেন না, ঠিক তেমনি যে ব্যক্তি প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্বন্ধে সচেতন, তিনি একজন সুযোগ্য প্রকৃত নাগরিক হতে পারেন না।

Leave a Reply

You can use these tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>