মানব সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের জীবনরীতি ও আচার প্রথা এবং কার্যপদ্ধতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে এবং আসছে। মনুষ্য সমাজের সভ্যতা ও প্রগতিই এর কারণ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।
পরিবেশ কি, কেন, এর সৃষ্টি এবং সংরক্ষণ, এ নিয়ে অনেক রাসভারী রচনা হয়েছে এবং প্রতিনিয়ত হয়ে চলেছে। তবে এর একটু ঝিমিয়ে পড়া দিকের প্রসঙ্গ নিয়েই আরও একটি কলমের জিলাপীর প্যাচ আরম্ভ করতে যাচ্ছি। ধৈর্য নিয়ে পড়ে দেখুনই না, সহৃদয় স্কাউট বন্ধুরা বিশেষ ধরনের কিছু দিতে অর্থাৎ, রসবিহীন রচনাটিকে রসবিহীন অপূর্ব সোয়াদের স্পেশাল আমিত্তিতে রূপান-রিত করতে সক্ষম হতে পারি কিনা?
প্রথমেই আসা যাক প্রসঙ্গটির মূল অর্থাৎ, বন্যপ্রাণী বিষয়টি নিয়ে। অর্থাৎ কেনই বা “বন্যেরা বনে সুন্দর” কে নিয়ে টানাটানি তার মর্ম ভেদ করতে?- সৃষ্টির আদিতে এই পৃথিবীটা বন্যের অধীনে ছিল। কিন’ মানব সভ্যতার সুচনা সেই বন্য পরিবেশে অধীনে ছিল। কিন’ মানব সভ্যতার সূচনা সেই বন্য পরিবেশে পরিবর্তন আনতে আরম্ভ করে। আসরাফুল মাখলুকাত মানব জাতি স্রষ্টার সবচেয়ে অমূল্য দান তার বুদ্ধিকে এই কাজে লাগায়। সফলতা হিসেবে তারা আবিষ্কার করে এবং করছে বন্যদের শিকার তথা হত্যার নানা কায়দা কানুন। আদিতে হলে আজকের এই আলোচনা অবান-র ছিল। কিন’ বর্তমান প্রেক্ষাপট এই রচনার চালিকাশক্তি।
এ নিয়ে আলোচনারও পূর্বে আমার এই লেখাটির বিষয় নির্ধারণ নিয়ে ব্যক্তিগত যে কারণটি কাজ করেছে, সেই মজার বিষয়টি বলি? যদিও ব্যক্তিগত তবে আপনারদেরও ঘটনাটি খারাপ লাগবে না বলে আমার বিশ্বাস-“কারণ এটি একটি বাস-ব গল্প।”
কিছুকাল আগে আমি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা প্রদানের নিমিত্তে খুলনা গমন করিয়াছিলাম। বলাবাহুল্য, খুলনা শহরেই আমার নানার বাড়ি অবসি’ত এবং আমি সেখানেই আমার আস-ানা গাড়িলাম। বিভিন্ন কারণে বহুকাল পর আমার খুলনায় আগমন লইয়া সকলের মধ্যেই একটা আলোড়ন পড়িল। কিন’ সকলকে বাদ দিয়া আমি একজনকেই মনে মনে খুঁজিতেছিলাম এবং অন-ত সাত বছর পূর্বে তাহার সাথে আমার রোমাঞ্চকর মুহূর্তগুলির স্মৃতি আওড়াইতেছিলাম। ভাবিতেছেন বোধ হয় কে এই বিশেষ একজন? আসলে তিনি বিশেষ একজন শুধু আমার কাছেই আর কাহারও কাছে নয়- নাম ‘কালু মিয়া’ অর্থাৎ কালু মামা। আর এই বিশেষ ব্যক্তিই আমার গল্পের নায়ক এবং এই রচনার স্রষ্টা।
কালুমামা একজন মজার মানুষ। আমার আপন বড় মামার বাল্যকালীন বন্ধু হওয়ায় এবং বাড়ির দেওয়ালে লাগিয়ে বাড়ি হওয়ায় তার আমার নানা বাড়িতে ছিল অবাধ যাতায়াত ও নিজ বৈশিষ্ট্যের জন্য আধিপত্য। সেই কত বছর আগে শেষ খুলনায় গিয়াছি কিন’ কেন এই ব্যক্তিটি বিশেষ একজনে পরিণত হইলেন, তাহাই এখন বলি। আমাদের নিচতলার বাড়িতে বসার ঘরে আড়ার মাথায় একটা বিশেষ জিনিস আমি দেখিতাম। জিজ্ঞাসা করিয়া জানিয়াছিলাম উহা নাকি কালু মামার প্রাইভেট প্রপার্টি এবং তাহার জান। বহু কষ্ট করি চারি মাইল পথ রোজ হাঁটিয়া ও টিফিন না খাইয়া চারি বৎসর সাধনা করিয়া তিনি উহা কিনিয়াছেন। উহা একখানি “এয়ারগান”, আর এইটি নিয়াই ঘটনার সূচনা। তৎকালে কালু মামা ছিলেন রক্তে দামামা বাজানো তরুণ। তাই এ্যাডভেঞ্চার তাহার জীবন সঙ্গী। কিন’ এই এ্যাডভেঞ্চারটি হইল পাখি শিকার করা। শুনিয়াছি সেকালে, না শুধু সেকালে কেন বর্তমানেও কালু মামার মত কুশলী শিকারী এই তল্লাটে নাই। নব কৈশরের আমিও সেই কালু মামার লেজুড় ধরে একদিন তাহার পিছু পিছু চলিলাম পাখি শিকারে। যাওয়ার আগে বার বার সাবধান করিলেন ‘তোর যেতে হবে না। তুই বাড়ি যা, আমি আর তোর ছোট মামা যাচ্ছি। তুই হেঁটে পারবিনে, তাছাড়া সাঁতারও জানিসনে, বিলে নৌকায়ও চড়তে হয় ডাহুক আর বড় জল পাখি মারতে। কিন’ আমিও নাছোড়বান্দা আমার মার কাছে যাইয়া নালিশ করিলাম। আর যায় কোথায়- নিতে রাজি হইলেন। এমন এক লম্ফ দিলাম যেন দুনিয়া জয় করিয়া ফেলিয়াছি। ভাব এমন সেই গানের মত “বন্দুক লইয়া রেডি হইলাম আমি আর মামু।” পুরাতন কাহিনী আর বাড়াইতেছি না তবে পাঠকবৃন্দ অবশ্যই অনুধাবন করিতে পারিতেছেন কিংবা কল্পনায় ভাসিয়া উঠিতেছে মামা আর ভাগনের সেই এ্যাডভেঞ্চার।
কিন’ সময় পরিবর্তন হইয়াছে। আজ আমি তারুণ্যের দুয়ারে সবে কড়া নাড়িতেছি আর কালু মামা দরজা বন্ধ করিতেছেন। কিন’ পরিবর্তনের মধ্যেও পরিবর্তন হয় নাই সেই নিচের বসার ঘরে ‘এয়ার গান।’ জার্মানীর তৈরি খুব যতনের সেই জিনিসটির অযত্ন হয় তো হইতেছে না। তবে অবহেলা কিঞ্চিত হইতেছে। মামাকে দেখেও তাজ্জব বনে গেলাম। কৈশরের রোমাঞ্চ নিয়ে তারুণ্যে যখন মামাকে শুধাইলাম ‘চলুন মামা একটু পাখি মেরে আসি, খুব মজা হবে।
স্লান হাসি দিয়া মামা কহিলেন- “সে দিন কি আজ আছেরে ছোড়া।”
- কেন কি হয়েছে? এই তো শেষ এসে আমি আর আপনি গিয়ে এই মাইল খানেক দূরে পশ্চিম পাড়ার বাঁশঝাড়ের থেকে দশটা ঘুঘু আর এগারোটা বক মেরে আনলাম।
আরে সে দিন আর নেই। এখন সারা দিন ২০/২৫ মাইল হাঁটলেও দু’টো বক জোটে না আর ঘুঘু, পানকৌড়ির দেখা পাওয়া আর আকাশে ভর দুপুরে চাঁদ দেখা একই কথা।
- আরে রাখেন মামা। যত সব বাহানা। না নিয়ে যাওয়ার ফন্দি তাই না।
- আচ্ছা এতই যখন খায়েশ কালই চল, ঠেলার নাম বাবাজি, বুঝছ্। তবে একথা ঠিক প্রতি মাসে যত কষ্টই হোক আর যেখানেই হোক আমি একবার পাখি মারতে যাই-ই।
পরের কোন কথাই তখন আমার কর্ণ গোচর হয়নি। সেই পূর্বের আনন্দ, অনেক কালের রোমাঞ্চ, জমা স্মৃতি সব মিলেমিশে এক বিষম অবস’া।
পরের দিন মামা আসিয়া আমাকে ডাকিলেন যখন, তখন বিকাল চারটা। আমি তো ক্ষেপিয়া লাল। সারাদিন অপেক্ষায় আছি আর এখন সূর্যাসে-র সময় কিনা আসিয়াছে,মনে মনে ভাবিলাম নিয়া যাইবে না বলিয়া মস্করা করিতেছে। কিন’ ভ্রম ভাঙ্গিলো যখন দেখিলাম মামা তাহার হোন্ডাটা লইয়া আমাদের উঠানে অপেক্ষা করিতেছেন। ঝটপট তৈরি হইয়া উঠানে দাঁড়াইতেই হাক দিলেন-
- বসার ঘর থেকে এয়ার গানটা নিয়ে আয়। সাবধানে যাতে নামাতে গিয়ে ব্যারেলে বাড়ি না লাগে। (এখানে একটি বিষয় জ্ঞাতব্য যে, কালু মামার আব্বা পাখি শিকার পছন্দ করে না বলিয়া তাহার এয়ার গান জীবনে তাহার বাড়ি যায় নাই এবং মাংস আমার নানা বাড়িতেই রান্না হয়)
সয্তনে ‘এয়ার গান’ নিয়ে এসে হোন্ডার পাশে দাঁড়াতেই মামা বলিলেন-
-এই টর্চ দু’টো জাকেটের পকেটে ভর আর এয়ার গান নিয়ে পেছনে বোস। খুব সাবধান, ফেলে দিবি না কিন’, তাহলেই ব্যারেল বেঁকে যাবে।
আমি আশ্চর্য হইলাম এখনও তাহার উহার প্রতি দরদ দেখিয়া, আমি শুধাইলাম-
- মামা হোন্ডা কেন? হেঁটেই তো যাই।
- মাথা খারাপ। সেই বিলের মাঝ দিয়ে ওয়াপদার বেড়ি পার হয়ে অনেক দূর যেতে হবে। হোন্ডাতেই ঘণ্টা লেগে যাবে আর উনি হেঁটে যেতে চাচ্ছেন।
আমি বলিলাম সর্বনাশ-“এই অবস’া।” তবুও উঠে বসিলাম। হোন্ডায় কিছু দুর যাইতেই মনে হইলো গতি যেন কিছুটা কমাইলেন মামা এবং হোন্ডা চলন- অবস’াতেই কথোপকথন আরম্ভ করিলেন আমার সহিত। বলিলেন,
- জানিস, আজকাল পাখি মারতেও না আর ভালো লাগে না। তবু আসি, যেন একটা নেশা, আমার মনের ড্রাগ। কিন’ প্রতিটি ড্রাগের যেমন একটা সাইড এ্যাফেট থাকে এরও আছে। আজকাল ঘুমাইলে রাতে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখি। দেখি সারা জীবনে মারা সব পাখি তোদের আর আমাদের বাড়ির পিছনের বাঁশ ঝাড়ে এসে বসে আছে। আর সব মানুষের মত কথা বলছে।
- ধুত! যত সব আজগুবি কথা।
- আরে আজগুবী তো আমিও জানি তবু শুনে রাখ। পাখিগুলোর আমার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ। আর তাই তারা আইনের আশ্রয়ের জন্য এই বাঁশ ঝাড়ে এসেছে আর তোর উকিল খালুকে ডাকছে। কথাটা শুনে আমার যেন মনটা কেমন হয়ে গেল নিজের অজানে-ই বললাম-তারপর,
মামা আবার শুরু করলেন;
- তাদের আমার বিরুদ্ধে নালিশ আমি তাদের খুন করেছি। তাদের বংশ নির্বংশ করেছি। তাদের এই বাঁশ ঝাড় থেকে বিল পেরিয়ে সেই দূরে পাঠিয়ে দিয়েছি। অন্যদের পাখি মারা শিখিয়েছি। এমন কি যখন তারা সংখ্যায় কম এবং একটু বুদ্ধি এঁটে দিনে আমার বন্দুকেন নল থেকে বাঁচতে শিখেছে, তখন রাতে তাদের কিভাবে হত্যা করা যায় তার ফন্দি বের করেছি। দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন থাকলেও তা অগ্রাহ্য করেছি। আরও কত কি? এই নিয়ে তারা হরতাল করবে, আমার বিরুদ্ধে ডায়রেক্ট অ্যাকশান দাবি করছে। এমন কি আমার যে জুট মিলের চাকরীটা চলে গেছে এবং অসম্মানজনক হলেও সত্যি আমারই ছোট বেলার বন্ধু তোর মামার দোকানে সেলস ম্যানের কাজ করে জীবন কাটাতে হচ্ছে, তার জন্য নাকি মৃত পাখিদের অভিশাপই দায়ী।
মামার কথাগুলো যেন আমাকে এলোমেলো করে দিল। মনে পড়ল হঠাৎ-ই, আমি না স্কাউট। আমি না স্কাউট আইন অনুযায়ী জীবের প্রতি সদয়। কিন’ এ কি করতে যাচ্ছি আমি। জবি হত্যা। বন্যপ্রাণী নিধন। যারা নির্বংশ হওয়ার পথে। এটা কখনই আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
- চলুন মামা ফিলে যাই।
- কেন রে?
- না এমনিই।
সত্য বলিতে আমি লজ্জিত হইয়াই সত্য গোপন করিলাম। আমি বলিতে পারিলাম না, আমি স্কাউট হইয়াও নিছক মজার জন্য কি এক কাজেই মাতিয়াছিলাম। এ যে কতটা লজ্জাকর।
- বন্ধুগণ এই মাত্র একটি সাধু চলিত মিশ্রিত গল্প (যদিও ১০০% সত্য) ও ঘটনার পরিসমাপ্তি ঘটালাম। আর কোন প্রসঙ্গ বা আলোচনার প্যাঁচ নয়। আশা করি আমার বক্তব্য বোধগম্য হয়েছে আমার প্রিয় স্কাউট পাঠকবৃন্দের।
তবে গল্পের নটে গাছ মুড়ালেও বাস-বের নটে গাছ কিন’ মুড়াবার নয়। অবশ্যই স্কাউট হিসেবে, বিবেকবান ব্যক্তি হিসেবে আজকের গল্পের চিরন-ন সত্যটিকে আমাদের ব্যক্তিগত বাস-ব জীবনে প্রতিফলিত করব। তবেই আমার নবজাতকের জন্য এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য, সুন্দর ও আদর্শ করে রেখে যেতে পাবে। সবাইকে ধৈর্য ধরে পঠনের জন্য ধন্যবাদ।