বিংশ শতাব্দীর ক্রানি-লগ্নে বর্তমান বিশ্বে কম্পিউটারের দক্ষতা মানুষের প্রয়োগ বৃদ্ধির ফলে এমনই বর্ণাঢ্য হয়ে উঠেছে যে, জগৎ ও জীবনের এমন কোন ক্ষেত্র নেই যেখানে কম্পিউটার অপরিহার্য হয়ে উঠছে না। সেই বিজ্ঞানের অদ্ভুত বিস্ময় নিয়েই আজকে আমার এই রচনা। আলোচনার শুরুতে বলে রাখি, এখানে আমি কম্পিউটার ও তার নানাবিধ দিক নিয়ে একটি সম্পূর্ণ উপস’াপনার চেষ্টা করব এবং আমাদের স্কাউটিং আন্দোলনে তার প্রভাব ও প্রয়োগ নিয়ে কিছু বলব। লেখাটি সকলের জন্য। বিশেষ করে আমাদের মধ্যে যারা এই বিষয়টির শুধু নাম জেনেই ক্ষান- আছেন কিংবা যাদের দৌড় কম্পিউটার দিয়ে এস.এস.সি কিংবা এইচ.এস.সি এর খাতা দেখা হয় ও ফলাফল বিভ্রাট ঘটে, তাদের জন্য।
প্রথমে জেনে নেয়া যাক, কম্পিউটার জিনিসটা আসলে কি? এবং তার জন্মের কিছু আদি ইতিহাস। আভিধানিকভাবে কম্পিউটার অর্থ হচ্ছে ‘হিসাবকারী যন্ত্র।’ এটি এমনই একটি যন্ত্র যা অর্থগত ও গাণিতিক নির্দেশমান রচনা করতে পারে। আবার উপযুক্ত নির্দেশের প্রভাবে কম্পিউটার জড় পদার্থ থেকে গাণিতিক শক্তিসম্পন্ন বুদ্ধিমান যন্ত্রে পরিণত হয়। প্রকাশনা ক্ষেত্রে প্রকৌশলী হতে শিল্পী, শিক্ষার্থী হতে গৃহিণী, রনপতি হতে কোটিপতি, এমনকি বৈজ্ঞানিক সবাইকে কম্পিউটার দক্ষতার সাথে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিনই বাড়ছে এর প্রয়োগ বিধি।
কিন’ উপকারী এই যন্ত্রের আবিষ্কার কিন’ আমার লেখার মত এত সহজ ছিল না। ক্যাম্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত শাস্ত্রের অধ্যাপক চার্লস ব্যাবেজ ১৮৩৫ সালে গাণিতিক রাশি গণনার স্বয়ংস্ক্রিয় যন্ত্র উদ্ভাবনের কথা ভেবেছিলেন, যার নাম তিনি দিয়েছিলেন, ‘এ্যানালাইসিস মেশিন। ব্যাবেজের এই পরিকল্পনা আধুনিক কম্পিউটারের মূলনীতি হিসাবে পরিগণিত হয়। ১৮৭১ সালে তাঁর মৃত্যুর পর হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হাওয়ার্ড আইলেক ব্যাবেজের পরিকল্পিত গাণিতিক যন্ত্রের ধারা অনুসরণ করে ১৯৪৪ সালে ‘মার্ক-১’ নামক বৈদ্যুতিক কম্পিউটার নির্মাণে সফল হন। প্রথম উদ্ভাবিত এই ম্যাকানিকাল কম্পিউটার ৫১ ফুট রম্বা ও ৮ ফুট উঁচু ছিল এবং ওজন ছিল প্রায় ৫ টন। কি সাংঘাতিক দানবীয় যন্ত্রই এটি ছিল? তাই না, ১৯৪৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্যালস্যালভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণ ডিজিটাল কম্পিউটার উদ্ভাবন করেন। কম্পিউটার পরিচালনার জন্য নির্দেশিকা (বা প্রোগ্রামিং) উদ্ভাবিত হয় ১৯৬০ সালে এবং প্রতি নিয়তই এর নতুন নতুন নির্দেশিকা উদ্ভাবিত হচ্ছে।
আসলেই কি কম্পিউটার আধুনিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ! আসুন, এবার তার কিছু কথা জানা যাক।
বনচারী মানুষ কৃষি জীবনে সি’র হবার পর প্রযুক্তির উদ্ভাবন বেগবান হয়েছিল। আমরা কৃষি বিপ্লবে অগ্রণী ছিলাম। ফলে আমাদের দেশ কৃষি সম্পদে সমৃদ্ধ ছিল। কিন’ কৃষিকে ছাপিয়ে ইউরোপে জন্ম নিল শিল্প বিপ্লব তথা রেনেসার। আমরা তার অংশীদার এখনও হতে পারিনি। ফলে শিল্প বিপ্লবের যুগে আমরা দরিদ্র থেকে আরও দরিদ্র দেশে পরিণত হলাম। এখন এসেছে আর এক বিপ্লব কম্পিউটার। যাকে তথ্য বিপ্লব হিসেবে নামাংকিত করা হয়েছে। এ বিপ্লবে যদি আমরা অংশ নিতে না পারি, তবে আমাদের অসি-ত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে। কারণ বর্তমান যুগ এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রই এখন তথ্য নির্ভর হয়ে পড়ছে। আর তথ্য বহনের একক দাবিদার হিসেবে এসেছে কম্পিউটার প্রযুক্তি। উন্নত বিশ্বের অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে সবকিছুই এখন কম্পিউটার প্রযুক্তির আওতায় এসে গেছে। এমনকি দ্রুত উন্নয়নশীল ও উন্নয়নকামী দেশগুলোও তাদের সমাজ ব্যবস’াকে কম্পিউটার নির্ভর করে তুলেছে। নব জীবন-জগত গঠনের একমাত্র বাহন ও হাতিয়ার-কম্পিউটার।
স্বভাবতই প্রশ্ন আসে কম্পিউটার হাতি না ঘোড়া, এটা কিভাবে কাজ করে? কি কি হয় এ দিয়ে/ এগুলো হচ্ছে কম্পিউটার প্রযুক্তির সবচেয়ে জটিল ও রাসভারী বিষয়। সহজে তার বর্ণনা সম্ভব নয়। তবুও একটু চেষ্টা করি বর্ণনার। যদি কেউ উপকৃত হয়।
কম্পিউটার কাজ করে সেই নিয়মে ঠিক যে নিয়মে আমরা সহজলভ্য ক্যালকুলেটর নিয়ে হিসাব করি। এতে দু’টো জিনিসের দরকার হয়। যোগ করার মেশিন, যোগ-বিয়োগ-ভাগ-পুরণের দিশা রাখার জন্য লিখে রাখার কাগজ, নামতা এবং বর্ণনার ধাপগুলো ঠিক রাখার জন্য মানসিক নিয়ন্ত্রণ। আসলে একটি কম্পিউটার এই দিকগুলোকে একত্রিত করে কাজ করে। মানুষের স্নায়ু কোষের মত বুদ্ধিমান যন্ত্র কম্পিউটারের হাজার রকমের ইলেক্ট্রনিক সার্কিট আছে।
কম্পিউটারের গাণিতিক ইউনিট খুব গতিশীল। নিয়ন্ত্রণ বা কন্ট্রোল ইউনিট তার পরিচালক মানুষটির কর্ম পরিকল্পনার প্রতিরূপ। মেমোরী ইউনিট অনেকটা হিসেবের দিশা রাখার নামতা ও কাগজের মত। কম্পিউটারের স্মৃতি ভান্ডারে আমরা তথ্য সংরক্ষণ করতে পারি। প্রয়োজনীয় নির্দেশনামা দিলে কম্পিউটার স্বয়ংস্ক্রিয়ভাবে কিছু ধাপ অতিক্রম করে প্রদত্ত সমস্যার সমাধান বের করে দেয়, যা তার ডিসপ্লে বা টিভি’র ন্যায় স্ক্রীনের পর্দায় প্রদর্শিত হয়। কম্পিউটার তার স্মৃতিভান্ডারে রক্ষিত সংখ্যা, চিহ্ন, রং, আঙ্গিক বিন্যাস, নির্দেশ অনুযায়ী খুঁজে এনে চালকের ইচ্ছানুযায়ী কাজের সমাধান প্রদান করে।
আসুন, ধৈর্যশীল ও সম্মানিত পাঠকবৃন্দ আরও কিছু তথ্য ও কম্পিউটারের সাধারণ কিছু জ্ঞাতব্য কষ্ট করে রসহীনভাবে জেনে নেই। বলাতো যায় না, কাজে আসতেও পারে।
আকার ও কার্যক্ষমতার বিচারে কম্পিউটার প্রধানত চার ধরনের ঃ
১. সুপার কম্পিউটার
২. মেইন ফ্রেম কম্পিউটার
৩. মিনি কম্পিউটার
৪. মাইক্রো কম্পিউটার
আমাদের দৈনন্দিন কাজে ও সচরাচর ব্যবহৃত কম্পিউটার হলো ডিজিটাল কম্পিউটার। কম্পিউটার জগতে বিচিত্র শব্দাবলীর উচ্চারণ সংরক্ষণ। এসব শব্দের মর্মোদ্ধার খুবই সহজ। অথচ তার সাথে পরিচিত না হলে কম্পিউটার জগতকে মনে হবে দুর্বোধ্য ও দুর্ভেদ্য এক রহস্যময় ‘বারমুডা ট্রাএ্যাঙ্গেল।’
কম্পিউটার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কিছু শব্দ ও তাদের অর্থ হলো ঃ
কী বোর্ড-টাইপ রাইটারের কী বোর্ড সদৃশ। কম্পিউটারে তথ্য প্রবেশের মেশিন।
স্ক্রীন- টেলিভিশনের পর্দার ন্যায়। এতে কম্পিউটারের তথ্য, কার্যক্রম প্রদর্শন করা হয়।
ডিস্ক- তথ্য সংরক্ষণের মাধ্যম বা ক্যাসেট, যা খামাকৃতির কালো প্লাষ্টিক কার্ডের ন্যায়।
ডিস্ক ড্রাইভ- এই মুখ্য যন্ত্রের সাহায্যে ডিস্কে তথ্য প্রবেশ বা বের করে স্ক্রীনে আনা হয়, ছোট ফাইল বক্সের মত।
প্রিন্টার-ছাপানো যন্ত্র।
ওয়ার্ড প্রসেসিং-কম্পিউটারে হরফ বিন্যাস বা কম্পোজ ইত্যাদি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কম্পিউটার প্রযুক্তি এক নব সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। কম্পিউটারের বিস্ময়কর অবদান মানুষের জীবন ও সভ্যতার সকল ক্ষেত্রকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করছে। ব্যবস’াপনা, প্রশাসন, শিল্প, বিজ্ঞান, গবেষণা, চিকিৎসা, যোগাযোগ ব্যবস’া, বিনোদন প্রভৃতিতে কম্পিউটারের ব্যবহৃত দ্রুত গতিতে মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। সূচনা হয়েছে কম্পিউটার বিপ্লবের। এ বিপ্লবের ছোঁয়া একেবারেই রূপসী বাংলার রূপে লাগেনি বললে মিথ্যে বলা হবে। উন্নত দেশগুলোর অবস’া দেখে উন্নত প্রযুক্তি গ্রহণের ফলে বেকার তৈরির ভয় করার কোন যুক্তিই নেই এখানে। অনেক ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিনিয়োগকৃত মূলধন সবচেয়ে কম সময়ে ফেরত পাওয়া সম্ভব হয়। ফলে পুনরায় কর্মসংস’ানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়। কম্পিউটার ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নত মেধা ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মানব সম্পদ তৈরি হয় এবং তার মেধা বার বার উচ্চমূল্যে বিক্রি করা যায়। কাজেই আমাদের দেশের দুর্বল অর্থনৈতিক অবস’ায় কম্পিউটার শিক্ষা ও প্রয়োগ বেশি গুরুত্ব পাবার দাবি রাখে।
১৯৬৪ সালে ঢাকা পরমাণূ শক্তি কেন্দ্রে ‘আই,বি,এম-১৬২০’ কম্পিউটার স’াপনের মাধ্যমে দেশে কম্পিউটারের প্রচলন শুরু হয়। ১৯৭১ সালের পূর্বে ও পরে আমাদের দেশে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার স’াপিত হয়। আশির দশকের গোড়ার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক দপ্তরে মেইনফ্রেম কম্পিউটার স’াপন করা হয়। ব্যাপকভাবে না হলেও আশির দশকেই বাংলাদেশে কম্পিউটারের জাগরণ সৃষ্টি হয়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় কম্পিউটারে উচ্চ শিক্ষার জন্য আলাদা বিভাগ রয়েছে। এছাড়া খন্ডকালীন কোস দেয়ার জন্য অনেক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা, সরকারী-বেসরকারী কার্যালয় কম্পিউটরায়ন করা হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন কাজে কম্পিউটার ব্যবহৃত হয়। শিক্ষা, গবেষণা, ব্যাংকিং, বীমা, টিকেট বুকিং, লেনদেনের হিসাব, ডাটা বিশ্লেষণ, চিঠিপত্র ও রিপোর্ট তৈরি, কম্পোজ ইত্যাদি এ ধরনের ব্যবহারের উদাহরণ। কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত শিল্প কারখানাও গড়ে উঠেছে এদেশে। এক কথায় বলা যায়- এদেশে এ মাধ্যমের ভবিষ্যত উজ্জ্বল।
কম্পিউটারের গুরুত্ব অনুধাবন করে ‘বাংলাদেশ স্কাউটস্ ও জাতীয় সদর দপ্তরে কম্পিউটার স’াপন করে এর কার্যক্রমকে বেগবান করতে সচেষ্ট। বিভিন্ন জাম্বুরী ও মুটসমূহে কম্পিউটার প্রদর্শনীরও ব্যবস’াকরা হচ্ছে। কিন’ এ মুহূর্তে যে জিনিসটির দরকার তা হলো, স্কাউটিং প্রোগ্রামে বাস-বসম্মত কম্পিউটারের প্রয়োগ।
লেখাপড়ার পাশাপাশি স্কাউটিং করে আমরা হয়তো আদর্শ নাগরিক হয়ে উঠছি কিন’ আমাদের ভবিষ্যত কি উজ্জ্বল? কিছু পাবার, জীবনে কিছু করার আশা তো মানুষ অবশ্যই করে। যোগ্যতাসম্পন্ন আদর্শ নাগরিক হয়েও বেকার সমস্যায় আমরা অনেকই হয়তো জর্জরিত কিংবা পদদলিত হবো। কাজ পাবার নেশায় আমরা রান্না পর্যন- শিখে ফেলি। প্রোজেক্ট বাস-বায়নের জন্য ও বিকল্প কর্মসংস’ান সম্পর্কে জ্ঞানার্জনে স’াপন করি হাঁস-মুরগির ফার্ম। কিন’ যদি কম্পিউটার শিক্ষাকে অন্যান্য অনেক দেশের স্কাউট প্রোগ্রামের ন্যায় বাধ্যতামূলক অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তবে অবশ্যই আমরা এক সুন্দর ভবিষ্যত গড়ে তুলতে পারব স্কাউটিং প্রোগ্রামের মাধ্যমে। ফলে একদিকে যেমন দেশ ও সমাজ গতিময়তা লাভ করে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাবে, তেমনি বদলে যাবে আমাদেরও জীবন।
সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ইচ্ছা থেকেই আমার অনুসন্ধানী মনের খোরাকের জন্য সংগৃহীত কিছু তথ্য নিয়ে আমার এই অপটু রচনা। তবু যদি কারও উপকারে আসে, কোন স্কাউট ভাইকে যদি আগ্রহী করতে পারি, তবেই আমি স্বার্থক।
পরিশেষে বলা যায়- ছোট বেলায় আমরা যখন পুতুল খেলায় মেতে থাকি তখন যদি প্রাচ্যের ছেলেমেয়েদের মত কম্পিউডটার চর্চায় ব্যস- থাকি, তবে আমাদের দেশও আরও পিছিয়ে থাকবে না। এটা স্বর্পরাজের মাথা থেকে মণি ছিনিয়ে নেয়ার মত কোন ঘটনা নয়। কারণ কম্পিউটার শানি-, উন্নতি ও সমৃদ্ধির বাহন।