আবহাওয়া পরিবর্তন, গ্রীন হাউজ এফেক্ট, মরুময়তা, পরিবেশ দূষণ শব্দগুলো আজ বহুল চর্চিত ও আলোচিত বিষয়। শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র বিশ্ব আজ এই সকল মরণঘাতী সমস্যায় হাবুডুবু খাচ্ছে। কারণ পরিবেশ ও সংশ্লিষ্ট এই বিষয়গুরো কোন ভৌগলিক সীমারেখা দিয়ে বাধা যায় না। উন্নত বিশ্বের স্বেচ্ছাচারিতার ভার শুধু তাদেরই নয়, আজ সকলকেই বহন করতে হচ্ছে। সেই সাথে অজ্ঞ অনুন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বও সমস্যা সৃষ্টিতে পিছিয়ে নেই। যে কারণেই ধরিত্রী সম্মেলনে আজ সকলেই ঐক্যবদ্ধ। বন্ধুগণ, এই বাগাড়ম্বরতা কিন’ আজকের রচনার প্রসঙ্গ নয়, সূচনা বাদ দিয়ে এখন প্রসঙ্গে আসি।
আজকের অনুধ্যানের বিষয় Bio Diversity বা জীব বৈচিত্র্য। জীবনের সৃষ্টির মধ্য দিয়েই স্রষ্টার এই সুন্দর পৃথিবীকে সাজানোর কাজ আরম্ভ হয়। কিন্তু তা ছিল একটি সুষ্ঠু বৈজ্ঞানিক কার্যধারার মাধ্যমে ধাপে ধাপে। পরিপূর্ণ জীবন বিধান কোরআনে এ সম্পর্কে বিশদ আলোচনা আছে। ইয়াসিন সূরা ও অন্য কয়েকটি স্থানে তার দৃষ্টান্ত- মেলে। বলা হচ্ছে- বৈচিত্র্যহীন পৃথিবীকে তার ঊষর রূঢ়। রূঢ় থেকে পরিত্রাণ দিয়ে সেখানে ফোয়ারার মিঠা পানি ও সেই সাথে সবুজ শ্যামলিমা সৃষ্টি করা হয়। তার পর ধাপে ধাপে সামঞ্জস্যের সাথে জীবকূল ও মানুষ। মানুষ তাই সৃষ্টির আদিতেই জীবন ধারনের খাদ্য, রেডিমেড বাসস্থান গুহা, পোষ্য কাজে ব্যবহারের জন্য পশু সবই খুঁজে পেয়েছিল। যার বিচক্ষণ ব্যবহারের মাধ্যমেই ধাপে ধাপে এগিয়ে গেছে সমাজ। এছাড়াও বাংলাদেশ ও পশ্চিবঙ্গের সাঁওতাল সমপ্রদায়ের একটি লোকগাথাও আমাদের বেশ আকৃষ্ট করে এ ব্যাপারে। তাঁদের মতে, পৃথিবীতে সৃষ্টির আদিতে যে পানি বা জলরাশি ছিল তার ওপর বিভিন্ন রকম জলজ উদ্ভিদ, কচুরীপানা এবং প্রকৃতির বনভূমির গাছপালার পাতা পচে আস-রনের ন্যায় জমতে থাকে। জমতে জমতে যে নরম বেলা ভূমির সৃষ্টি হয় আর ওপরেই দু’টি হাঁসের ডিম থেকে তাদের পূর্ব পুরুষ বা হুডুম সৃষ্টি হয়। তারাই পৃথিবীতে জনবসতি সৃষ্টি করে। জলের মাছ, গাছের ফল খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। পাঠক-পাঠিকাবৃন্দ হয়তো মনে করছেন এই প্রসঙ্গের অবতারণা করলাম কি জন্য? আমি চেষ্টা করেছি সৃষ্টির ধারাবাহিকতা সম্পর্কে আপনাদের সেই জ্ঞানকে মনে করিয়ে দিতে। অর্থাৎ,সবকিছু একটি ধারাবাহিক নিয়মের মধ্যে চলছে। খাদ্য শৃঙ্খল, পানি চক্র, গ্যাসীয় চক্রসমূহ প্রভৃতি দ্বারা স্রষ্টা একটি ধারাবাহিক ছকের মাঝে আমাদের ছেড়ে দিয়েছেন সুশৃঙ্খলভাবে চলার জন্য। কিন্তু উন্নতরি সাথে সাথে বিভিন্ন প্রযুক্তির আবিস্কার ও ব্যবহার এই শৃঙ্খলায় কিছু বিশৃঙ্খলতার সৃষ্টি করছে। সকল ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীব, উদ্ভিদ, প্রাণীদের প্রকার, প্রকরণ, প্রজাতি, বংশানুগতি সম্বন্ধীয় পার্থক্য-এসব নিয়েই পরিবেশ এবং তাকে নিয়েই আলোচিত একটি বিষয় Bio Diversity ভৌগলিক বিস্তারের ভিন্নতর কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ প্রাণী তথা জীব সমপ্রদায় দেখা যায়। ফলে স্থান, কাল, পাত্র বিশেষে পরিবেশ সাজানোর আসবাবে তারতম্য থাকে। প্রকৃতির বাস্তুসংস্থানের সমগ্র প্রক্রিয়ায় এসব জীব, গাছপালা, প্রাণী অভিযোজিত এবং স্বাভাবিকতাসম্পন্ন। যেমন- মরুভূমির তপ্ত বালুতে বাবলা, খেজুর বাগিচা অনায়াসে জন্মে! আর সুন্দরবনের লবনাক্ততায় ম্যানগ্রোভ ছাড়া কি জন্মাতে পারে! আরও সোজা করে বলি- আমি কাগজ কলম নিয়ে, রাত দুপুরে লাইট জ্বালিয়ে নিরস আলোচনা করছি, যা আমি নিজেই ঠিকমত সীমিত জ্ঞানে অনুধাবন করার চেষ্টা করছি। এখন বলুন-কলম, কাগজ, আলো কোনটি বাদে কোনটি চলতে পারে। এই ইকোসিস্টেমের (Ecosystem) বিশৃঙ্খলাই জীব বৈচিত্র্যের বিনাশের কারণ। ছোট্ট একটি ঘটনা বলি- ওয়েস্ট ইন্ডিজের একটি দ্বীপে সাপের ভয়াবহতা থেকে নিস্কৃতির জন্য একবার সেখানে আমদানী করা হলো কিছু বেজীর। যার ফলশ্রুতিতে সেখানে ভয়াবহ প্রাকৃতিক সমস্যার জন্ম হলো। হ্যামিলনে বিড়ালগুলো ইঁদুর খেয়ে তাদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না বলেই তো যত কান্ড। আর অষ্ট্রেলিয়ায় খরগোশ তাদের বিশাল বাহিনী নিয়ে যে যুদ্ধ চালায় সবজী ক্ষেতে ও ফসলের মাঠে! জীব বৈচিত্র্যের মাধ্যমে ভূধরের স্বাভাবিকতাই স্থান, কাল ও পাত্র বিশেষে নিয়ন্ত্রিত হয়। শোনা যায় বিষধর সাপ নাকি বাতাস থেকে অজানা মারাত্মক সব বিষাক্ত পদার্থ গ্রহণ করে থাকে। যদি সত্য হয়, তবে দেখুন বিষাক্ত সাপের প্রয়োজনীয়তা।
এখন আসুন জীবন বৈচিত্র্যের বিনাশে বাংলাদেশের সমস্যায়। কাপ্তাই-এ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির ফলে এখানে মারাত্মক জীবন বৈচেত্র্যের বিপর্যয় দেখা যায়। ম্যানগ্রোভ বন কেটে চিংড়ি চাষ, নতুন করে বনায়নে কিছু বিশেষ ধরনের গাছ একই স্থানে জন্মানো এবং জনসংখ্যার অত্যধিক বৃদ্ধি, একাধারে লবনাক্ততা বৃদ্ধি, মাটির উর্বরতা হ্রাস নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি করছে। এবার সেই সৃষ্টির আদি ধাপ বা ছক কিংবা যাকে একটি জটিল ম্যাথমেটিক্যাল ফরমুলা বলা যেতে পারতো তার সাথে বসিয়ে মান বের করুন। এটিই জীব বৈচিত্র্যের বিনাশ ও প্রাকৃতিক সমস্যা। এসবের ফলে লাভের গুড় পিঁপড়েকে দিয়ে আমরা কি কি হারিয়েছি, তার একটা খতিয়ান দেখুন-
১. গাছের প্রজাতি-৩৫ রকমের।
২. ভার্টিভ্রাটা প্রজাতি-১৩২ রকমের।
৩. স-ন্য প্রাণীর প্রজাতি-১২ রকমের।
৪. পাখি প্রজাতি-৫ রকমের।
সোনালী বিড়াল, নীল গাই, শিংওয়ালা গন্ডার আজ বিলুপ্ত। চট্টগ্রামের বনের লজ্জাবতিবানর (Slow lorris) আজ মুখ দেখাতে লজ্জা পায়, আর গয়াল কোন গোয়ালঘরে যে থাকে তার সন্ধান পাওয়া দুস্কর। কত যে অজানা রোগের অজানা বনৌষধি হারিয়ে গেছে তার ইয়ত্তা নেই।
পরিশেষে বলা যায়, জীব বৈচিত্র্যের বিনাশ রোধকল্পে আমাদের সচেষ্ট হতে হনে পূর্ণ সজা ও সচেতনার মাধ্যমে। ডডঋ এর সাথে হাতে হাত মিলিয়ে অন্যান্য দেশের স্কাউটদের মত আমাদেরও বাংলাদেশ সরকারের সাথে এক্ষেত্রে কাজ করার নিত্য নতুন পরিকল্পনা বাস-বায়ন করতে হবে। শুধু নেচার স্টাডি বা প্রকৃতি পাটে, গাছের উচ্চতা মাপা, পাতার ধরন ও সংগ্রহে তা হবে না। কিংবা ‘বিশ্ব সংরক্ষণ’ ব্যাজ অর্জন কঠিন, খুব কঠিন এবং ব্যর্থতাই স্বাভাবিক- এই ধারণাকে পরিবর্তন করে সত্যিকারের মৃত্যুর আগে পৃথিবীকে কিছু দিয়ে যাবার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হবার কি এখনই উপযুক্ত সময় নয়?